নানির শাড়ি হাতে নিলাম। নীল রঙের। এখনো গন্ধ লেগে আছে।
চোখ বন্ধ করলাম। শুঁকলাম।
নানি নেই। কিন্তু গন্ধ আছে।
হ্যাপি ঘরে এল। “কী করছ?”
“কিছু না। শাড়ি দেখছি।”
“নানির?”
“হ্যাঁ।”
হ্যাপি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, “নানি কবে গেলেন?”
“দুই মাস হলো।”
“তুমি ঠিক আছ?”
জানি না। ঠিক আছি কি?
“হ্যাঁ।”
হ্যাপি চলে গেল। আমি শাড়ি রেখে দিলাম।
মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। গ্রামে থাকতাম। নানুবাড়িতে যেতাম গ্রীষ্মের ছুটিতে।
নানি ডাকতেন, “সোনা, এসো খাও।”
আমি দৌড়ে যেতাম। নানির কোলে মাথা রাখতাম। গল্প শুনতাম।
সেই ছেলে কোথায়?
গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম। অনেকদিন পর।
সেই বেঞ্চে বসলাম। যেখানে সন্ধ্যায় বসতাম। বন্ধুদের সাথে।
কথা বলতাম। হাসতাম। স্বপ্ন দেখতাম।
কিন্তু এখন বসে কিছু লাগল না। শুধু একটা বেঞ্চ। কাঠের।
সেই অনুভূতি কোথায় গেল?
সাইফুল ফোন করেছিল সপ্তাহখানেক আগে।
“কেমন আছিস?”
“ভালো। তুই?”
“ভালো। মনে আছে কলেজের শেষ দিন?”
মনে আছে। সবাই কাঁদছিল। জড়িয়ে ধরছিল।
“যোগাযোগ রাখব,” সবাই বলেছিল। “প্রতিদিন কথা হবে।”
মিথ্যা।
দুজনের সাথে কথা হয়। বছরে একবার। বাকিরা কোথায়? জানি না।
“হ্যাঁ, মনে আছে,” আমি বললাম।
“সেদিন ভেবেছিলাম সবাই মিলে সারাজীবন থাকব। কী হাস্যকর না?”
হাস্যকর না। সবাই তাই ভাবে।
ফোন রাখার পর ভাবলাম। সেই বন্ধুত্ব কোথায় গেল?
নতুন বন্ধু হয়েছে। সুলতান। অফিসে চাকরি শুরুর পর পরিচয়।
ভালো বন্ধু। কিন্তু সেইরকম না। কলেজের বন্ধুদের মতো না।
হয়তো সেই বয়স আর নেই। সেই সময় আর নেই।
আরাশ এসে বলল, “আব্বু, তুমি কি নানিকে মিস করো?”
“হ্যাঁ।”
“আমিও করি। নানি আমাকে চকলেট দিত।”
“হ্যাঁ, দিত।”
“নানি কেন গেল আব্বু?”
কী উত্তর দেব?
“মানুষ একদিন চলে যায় আরাশ।”
“সবাই?”
“হ্যাঁ।”
“তুমিও?”
“হ্যাঁ।”
আরাশ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি চাই না তুমি যাও।”
আমিও চাই না। কিন্তু একদিন যেতে হবে।
“আমি এখনো আছি,” আমি বললাম।
আরাশ চলে গেল খেলতে।
রাতে হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি প্রথম প্রেমের কথা মনে করো কখনো?”
অদ্ভুত প্রশ্ন। কেন জিজ্ঞেস করছে?
“কখনো কখনো। তুমি কেন জিজ্ঞেস করছ?”
“এমনি। ভাবছিলাম তুমি তখন কেমন ছিলে।”
তখন কেমন ছিলাম?
“অন্যরকম।”
“কীরকম?”
“ভাবতাম ভালোবাসা চিরকালের। একসাথে বুড়ো হব।”
“এখন?”
“এখন জানি সব শেষ হয়।”
হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুমি কি মনে করো আমাদেরও শেষ হবে?”
“জানি না। হয়তো।”
“তুমি সত্যি বলছ।”
“হ্যাঁ। সব শেষ হয়। মানুষ মরে। প্রেম শেষ হয়। বন্ধুত্ব হারিয়ে যায়।”
হ্যাপি কিছু বলল না। উঠে জানালার পাশে গেল।
আমি বললাম, “কিন্তু এখন আমরা আছি। এটাই তো গুরুত্বপূর্ণ।”
হ্যাপি ফিরে তাকাল। “তুমি এমন কথা বলো কেন? সব শেষ হয়, সব মরে যায়?”
“কারণ সত্যি।”
“কিন্তু বলার দরকার আছে?”
আছে কি? জানি না।
মনে পড়ল বাবার কথা। বাবা মারা যাওয়ার দিন।
হাসপাতালে গিয়েছিলাম। দেরি হয়ে গেছে। বাবা চলে গেছেন।
মা কাঁদছিলেন। “শেষবার কথা বলতে পারলাম না।”
আমিও পারিনি। সেই সকালে অফিসে যাওয়ার সময় বলেছিলাম, “বিকেলে আসব।”
কিন্তু বিকেল হয়নি।
সেই দিন আমার ভেতরের একটা ছেলে মরে গেল। যার একজন বাবা ছিল।
এখন আমি সেই মানুষ যার বাবা নেই। মা নেই। নানি নেই।
একদিন আরাশেরও এমন হবে। তার বাবা থাকবে না।
এই চিন্তা এলেই বুক কাঁপে।
পরদিন সকালে বাবুর সাথে দেখা করতে গেলাম।
বাবু বলল, “মনে আছে নানুবাড়ির আমগাছ?”
“হ্যাঁ।”
“ঝড়ে ভেঙে গেছে। তিন বছর হয়ে গেল।”
আমগাছ। কত ঘণ্টা কাটিয়েছি সেখানে। ডালে বসে থাকতাম। দূরে তাকাতাম।
এখন নেই।
“আচ্ছা বাবু, তুই কি মনে করিস আমরা পাল্টে গেছি?”
“কীভাবে?”
“মানে আমরা তো আর সেই ছেলে নই। যারা গাছে উঠতাম।”
বাবু হাসল। “না। আমরা পাল্টে গেছি।”
“কিন্তু মনে আছে।”
“হ্যাঁ। মনে আছে। কিন্তু সেই অনুভূতি নেই।”
ঠিক কথা। মনে আছে গাছে বসে থাকতাম। কিন্তু সেই আনন্দ? নেই।
বাসায় ফিরে নানির ঘরে গেলাম। জিনিসপত্র গুছাতে হবে।
একটা পুরনো ছবি পেলাম। নানি আর আমি। আমার বয়স হবে পাঁচ। নানির কোলে বসে আছি।
সেই ছেলে কে? আমি? হ্যাঁ, আমি।
কিন্তু মনে হয় অন্য কেউ। অচেনা।
আরাশ এল। “আব্বু, এটা কে?”
“তুমি চিনতে পারছ না?”
“না।”
“আমি।”
“তুমি? কিন্তু তুমি তো এমন না।”
“তখন এমন ছিলাম।”
“এখন?”
“এখন অন্যরকম।”
আরাশ ছবি দেখল। তারপর বলল, “আব্বু, মানুষ কি পাল্টায়?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“জানি না। এমনিই পাল্টায়।”
“তুমি কি আরো পাল্টাবে?”
“হ্যাঁ। তুমিও পাল্টাবে।”
আরাশ ভাবল। তারপর বলল, “আমি পাল্টাতে চাই না।”
“চাইলেও পাল্টাবে। সবাই পাল্টায়।”
রাতে শুয়ে ভাবছি। কতগুলো বিদায় হয়ে গেছে?
গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা। সেই ছেলে গেল।
স্কুল শেষ করে কলেজে যাওয়া। সেই বন্ধুত্ব গেল।
প্রথম প্রেম ভেঙে যাওয়া। সেই স্বপ্ন গেল।
বাবা মরে যাওয়া। সেই ছেলে গেল যার বাবা ছিল।
মা মরে যাওয়া। সেই মানুষ গেল যার মা ছিল।
নানি মরে যাওয়া। সেই নাতি গেল।
কতগুলো আমি মরে গেছে? কতগুলো বাকি?
হ্যাপি ঘুমাচ্ছে পাশে। শ্বাস নিচ্ছে। শ্বাস ছাড়ছে।
একদিন এই শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। হ্যাপিও যাবে। আমিও যাব।
আরাশ বড় হবে। একদিন তার কোনো বাবা থাকবে না।
সেদিন সে কাঁদবে। আমার ছবি দেখবে। ভাববে, “এই মানুষ কে ছিল?”
তারপর সে নিজেও পাল্টাবে। তার বাচ্চা হবে। সে বুড়ো হবে। সেও মরবে।
এভাবেই চলে। একে একে সবাই যায়।
মনে পড়ল নানির শেষ দিনের কথা। ফোন পেয়েছিলাম।
“তাড়াতাড়ি এসো। নানির অবস্থা খারাপ।”
বলেছিলাম, “আমি আসছি নানি।”
কিন্তু পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেরি হয়ে গেল। নানি চলে গেছেন।
শেষবার কথা বলতে পারিনি। শেষবার হাত ধরতে পারিনি।
এখন ভাবি, নানি কি অপেক্ষা করছিলেন? আমার জন্য?
জানি না।
চোখ বন্ধ করলাম। ঘুম আসছে না।
ভাবছি, কাল কোন বিদায় আসবে? কোন অংশ হারিয়ে যাবে?
জানি না।
হয়তো কিছুই হারাবে না। হয়তো সব হারাবে।
জানি না।
শুধু জানি প্রতিদিন কিছু না কিছু পাল্টাচ্ছে। প্রতিদিন কিছু না কিছু যাচ্ছে।
আর আমি থেকে যাচ্ছি। বাকি অংশ নিয়ে।
কতদিন? জানি না।
ঘুম এল। চোখ বন্ধ হয়ে এল।
স্বপ্নে দেখলাম নানি। হাসছেন। হাত বাড়িয়ে আছেন।
“সোনা, এসো।”
আমি যাচ্ছি। কিন্তু পৌঁছাতে পারছি না।
দূরত্ব কমছে না।
নানি মিলিয়ে যাচ্ছেন।
চোখ খুলল। সকাল হয়েছে।
হ্যাপি বলল, “কী হয়েছিল? স্বপ্ন দেখছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“কী দেখেছ?”
“নানিকে।”
হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এসো, চা খাও।”
চা খেলাম। ধীরে ধীরে।
আরাশ এল। “আব্বু, আজ আমরা কোথাও যাব?”
“কোথায় যেতে চাও?”
“জানি না। কোথাও।”
হ্যাঁ। কোথাও যাওয়া যায়।
আজ আছি। কাল? জানি না।
কিন্তু আজ আছি। এটুকু জানি।
এটুকুই হয়তো যথেষ্ট। হয়তো না।
জানি না।
একটু ভাবনা রেখে যান