ব্লগ

ছোট্ট কন্যার বিক্রীত শৈশব

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে পাড়ার হুজুর সাহেবের সাথে দেখা। হাসতে হাসতে বললেন, “হায়দার ভাই, শুনেছি আপনার মেয়ে নেই? থাকলে এখনই বিয়ে দিয়ে দিতেন। আইশা (রা) এর বয়সটা দেখেন।”

আমার বুকে পাথর চাপল। আরাশের দিকে তাকালাম। সে মাত্র ১১ বছর। এই বয়সে সে খেলাধুলা করে, বই পড়ে। যদি মেয়ে হতো, তাহলে কি তার শৈশবও কেড়ে নিতে হতো?

বাসায় ফিরে হ্যাপিকে বললাম। হ্যাপির মুখ ভার হয়ে গেল। “আমাদের পাশের বাড়িতে রিনা আছে না? ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। এখন ২০, দুইটা বাচ্চা। কী অবস্থা দেখেছো?”

দেখেছি। রিনাকে দেখলে মনে হয় ৩৫ বছরের কেউ। চোখে কোনো স্বপ্ন নেই। সারাদিন কাজে ব্যস্ত। পড়াশোনা অর্ধেকে বন্ধ। স্বামী তার চেয়ে ১৫ বছরের বড়।

রাতে ইন্টারনেটে খোঁজ নিলাম। দেখলাম আইশা (রা) এর বিয়ের বয়স নিয়ে স্কলারদের মধ্যে মতভেদ। অনেকে বলছেন উনার বয়স ছিল ১৮-২০। ঐতিহাসিক প্রমাণও আছে। কিন্তু কেউ শুনতে চায় না।

একজন ইসলামিক স্কলার লিখেছেন, “১৪০০ বছর আগের আরবীয় প্রেক্ষাপট আর এখনকার প্রেক্ষাপট এক নয়। তখন ১৩-১৪ বছরেই মেয়েরা শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিপক্ব হতো। এখনকার যুগে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনের বিবেচনায় এটা ক্ষতিকর।”

আরাশ এসে জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, আমার যদি বোন থাকত, তুমি কি তাকে ছোটবেলায় বিয়ে দিতে?”

আমার কণ্ঠস্বর কাঁপল। “কখনো না। মেয়েদেরও স্বপ্ন দেখার, পড়াশোনা করার, বড় হওয়ার অধিকার আছে।”

“তাহলে অন্যরা কেন দেয়?”

আমি বুঝতে পারলাম না কী বলব। বললাম, “কারণ তারা ধর্মকে ভুল বুঝেছে। ধর্ম কখনো ক্ষতি করতে শেখায় না।”

মনে পড়ে বাবার কথা। উনি বলতেন, “যে কাজে সৃষ্টির ক্ষতি, সে কাজে স্রষ্টার সন্তুষ্টি নেই।”

আমি ভাবি, একটি ১৩ বছরের মেয়েকে বিয়ে দিলে কী হয়? তার শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি। শিক্ষা বন্ধ। স্বপ্ন শেষ। সন্তান প্রসবের ঝুঁকি। এতসব ক্ষতির পরও কিভাবে কেউ বলে এটা ধর্মসম্মত?

আল্লাহ তো বলেছেন, “আর তোমরা ইয়াতিমদের ভাল হওয়া পর্যন্ত তাদের সম্পদের কাছেও যেও না।” ইয়াতিমদের পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছেন। তাহলে বিয়ের ক্ষেত্রে এই নীতি কেন প্রযোজ্য নয়?

বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি রিনা তার ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসে আছে। তার চোখে অক্ষম ক্লান্তি। আমার মন খারাপ হয়ে যায়।

আমি বুঝতে পারি যে, যারা বাল্যবিবাহের পক্ষে কথা বলেন, তারা আসলে নিজেদের লালসা আর নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে ধর্মের আবরণ দেন। একটি শিশুকন্যার ভবিষ্যৎ ধ্বংস করাকে তারা ‘সুন্নত’ বলেন।

কিন্তু আমার আল্লাহ কি সত্যিই চান যে মেয়েদের শৈশব কেড়ে নেওয়া হোক? নাকি তিনি চান প্রতিটি সন্তান – ছেলে হোক বা মেয়ে – সুস্থ, শিক্ষিত, পরিপক্ব হয়ে উঠুক?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *