ব্লগ

লজ্জার বিপরীত দিক

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে খবরে দেখলাম আরেকটি ধর্ষণের ঘটনা। কিন্তু সবচেয়ে যা মনটা খারাপ করল তা হলো কমেন্ট সেকশন। “মেয়েটা এত রাতে কেন বাইরে ছিল?”, “পোশাক দেখলেই বোঝা যায়”, “নিশ্চয়ই কিছু ইশারা দিয়েছে”।

আমার রক্ত জ্বলে উঠল। একটি মেয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, আর আমরা দোষ দিচ্ছি তাকেই?

অফিসে গিয়ে দেখি সহকর্মীরাও এই নিয়ে কথা বলছে। করিম বলল, “ভাই, মেয়েদেরও সাবধান থাকতে হবে। এমন পোশাক পরলে তো হবেই।”

আমি বললাম, “তাহলে ৮০ বছরের বুড়ি, ৫ বছরের বাচ্চা মেয়ে যাদের সাথে ধর্ষণ হয়, তাদের কী দোষ?”

করিম চুপ হয়ে গেল।

বাসায় ফিরে হ্যাপিকে বললাম। হ্যাপি বলল, “আমি কখনো একা রাতে বের হই না। ভয় লাগে। কিন্তু এর মানে এই না যে যারা বের হয় তাদের দোষ।”

আরাশ জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, ধর্ষণ কী?” আমি বুঝতে পারলাম না কিভাবে একটি ১১ বছরের বাচ্চাকে এই জঘন্য অপরাধের কথা বোঝাব।

রাতে ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে দেখি কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বও এই ধরনের মন্তব্য করেছেন। “মেয়েরা পর্দা না করলে পুরুষরা প্রলোভনে পড়ে।”

আমি হতভম্ব। এটা কি ইসলামের শিক্ষা?

কুরআনে স্পষ্ট বলা আছে (২৪:৩০), “মুমিন পুরুষদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে।” প্রথমে পুরুষদের বলা হয়েছে দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করতে।

হাদিসে আছে রসুল (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মেয়ের দিকে কুদৃষ্টিতে তাকায়, কিয়ামতের দিন তার চোখে আগুনের গরম সীসা ঢালা হবে।”

এখানে কি বলা হয়েছে মেয়েরা পর্দা না করলে পুরুষদের দোষ নেই?

আরো পড়লাম, ইমাম আবু হানিফা (র) এর ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ (র) বলেছেন, “যদি কোনো পুরুষ কোনো নারীকে জোর করে স্পর্শ করে, তাহলে সেই পুরুষকে শাস্তি দেওয়া হবে, নারীকে নয়।”

ইসলামের ইতিহাসে খলিফা উমর (রা) একটি ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন এবং ভিকটিমকে দিয়াত (ক্ষতিপূরণ) দিয়েছিলেন। ভিকটিমকে দোষ দেওয়া হয়নি।

তাহলে আজকে কেন আমরা ভিকটিমকেই দোষারোপ করি?

আমি ভাবি, যারা ধর্ষণের জন্য নারীকে দায়ী করেন, তারা আসলে কী করছেন? তারা অপরাধীর সাফাই গাইছেন। তারা এই বার্তা দিচ্ছেন যে পুরুষরা তাদের যৌন লালসা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

কিন্তু এটা পুরুষজাতির জন্য অপমানজনক। আমি একজন পুরুষ, আমি আমার ইচ্ছার নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি। লক্ষ লক্ষ পুরুষ পারে। তাহলে কেন আমরা সব পুরুষকে পশুর মতো চিত্রিত করি?

একটা মেয়ে জিন্স-টিশার্ট পরলে, দেরিতে ঘরে ফিরলে, বা পুরুষদের সাথে কাজ করলে – এগুলো কি ধর্ষণের আমন্ত্রণ? তাহলে ছোট বাচ্চা, বয়স্ক নারী, পর্দানশীন নারীরা যারা ধর্ষিত হন, তাদের কী দোষ?

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবি। আমি কি চাই আরাশ বড় হয়ে এমন একজন পুরুষ হোক যে মনে করে নারীর পোশাক বা আচরণ তার যৌন অপরাধের কারণ?

আমি চাই আরাশ বুঝুক – একজন পুরুষের দায়িত্ব হলো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। নারীর পোশাক, চলাফেরা, বা আচরণ – কোনো কিছুই যৌন নির্যাতনের জন্য অপরাধীর দায় কমায় না।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি – হে আল্লাহ, যারা তোমার নামে নারীদের দোষারোপ করে অপরাধীদের সাফাই গায়, তাদের সঠিক পথ দেখাও। আর যে নারীরা এই অত্যাচারের শিকার, তাদের ন্যায়বিচার দাও।

আমার বিশ্বাস, সত্যিকারের ইসলাম অপরাধীকে শাস্তি দেয় এবং নির্যাতিতকে সহায়তা করে। ভিকটিম ব্লেমিং ইসলাম নয়, এটি জাহেলিয়াত।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *