আজ সকালে ঘর গুছাতে গিয়ে হতাশ হয়ে গেলাম। গতকাল এত পরিষ্কার করেছিলাম। আজ আবার এলোমেলো। কাপড় এদিক-ওদিক। বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ধুলো জমেছে।
“কেন এরকম হয়?” আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম।
হ্যাপি বলল, “ঘর তো এরকমই হয়। ব্যবহার করলে এলোমেলো হবেই।”
কিন্তু আমার মনে হল—এটা শুধু ঘরের ব্যাপার নয়। আমার পুরো জীবনটাই এরকম। যত গুছানোর চেষ্টা করি, ততই বিশৃঙ্খল হয়ে যায়।
চাকরি পেলাম। দুমাস পর হারালাম। টাকা জমালাম। খরচ এসে শেষ করে দিল। স্বাস্থ্য ঠিক রাখার চেষ্টা করি। অসুখ এসে সব নষ্ট করে।
এটা কি একটা প্রাকৃতিক নিয়ম?
আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি দেখেছো—যা কিছু সুন্দর করে সাজাও, সেটা আবার এলোমেলো হয়ে যায়?”
“হ্যাঁ বাবা। আমার খেলনা। সকালে গুছিয়ে রাখি। সন্ধ্যায় দেখি সব এলোমেলো।”
“কেন এরকম হয় বলে মনে হয়?”
আরাশ ভেবে বলল, “হয়তো জিনিসগুলো একসাথে থাকতে চায় না।”
আমি অবাক হলাম। এগারো বছরের ছেলের এই উপলব্ধি।
আমার মনে পড়ল বিজ্ঞানের একটা নিয়ম। এনট্রপি। সব কিছু ক্রমশ বিশৃঙ্খল হয়ে যায়। শক্তি ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবস্থা ভেঙে যায়।
গরম চা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। কিন্তু ঠাণ্ডা চা নিজে থেকে গরম হয় না।
পাকা ফল পচে যায়। কিন্তু পচা ফল নিজে থেকে তাজা হয় না।
মানুষ বুড়ো হয়। কিন্তু বুড়ো মানুষ নিজে থেকে যুবক হয় না।
তাহলে কি আমার জীবনেও এই এনট্রপির নিয়ম কাজ করছে?
আমি ভাবলাম—আমার শৈশব কত সুন্দর ছিল। সহজ ছিল। বাবা-মা আছেন। কোনো চিন্তা নেই। সব কিছু গোছানো।
তারপর বড় হওয়ার সাথে সাথে জটিলতা বাড়তে লাগল। দায়িত্ব এলো। সমস্যা এলো। সম্পর্ক জটিল হলো।
এটা কি এনট্রপি? জীবনের ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলা?
কিন্তু তাহলে প্রশ্ন হলো—আমি কেন চেষ্টা করি গুছাতে? যদি সব কিছু বিশৃঙ্খল হয়েই যায়?
সন্ধ্যায় জামিউরের সাথে এই নিয়ে কথা হলো। সে বলল, “আরে ভাই, তুই ঠিক বলেছিস। আমার ব্যবসাও এরকম। একটা জিনিস ঠিক করি, দুটো নষ্ট হয়।”
“তাহলে আমরা কেন চেষ্টা করি?”
“কারণ থেমে থাকলে আরো খারাপ হবে।”
আমি বুঝলাম। জামিউর ঠিক বলেছে। এনট্রপি ঠেকানো যায় না। কিন্তু কমানো যায়।
যেমন আমি ঘর পরিষ্কার করি। একদিন পরে আবার নোংরা হয়। কিন্তু পরিষ্কার না করলে আরো নোংরা হতো।
আমি ব্যায়াম করি। তবুও বুড়ো হচ্ছি। কিন্তু ব্যায়াম না করলে আরো তাড়াতাড়ি বুড়ো হতাম।
আমি চেষ্টা করি সৎ থাকতে। তবুও মাঝে মাঝে ভুল করি। কিন্তু চেষ্টা না করলে আরো বেশি ভুল করতাম।
তাহলে এনট্রপির বিরুদ্ধে লড়াইটাই জীবন?
আমি আরো ভাবলাম। আমার সম্পর্কগুলো। হ্যাপির সাথে বিয়ের শুরুতে সব কিছু সহজ ছিল। এখন মাঝে মাঝে মতবিরোধ হয়। দূরত্ব তৈরি হয়।
এটাও কি এনট্রপি? সম্পর্কের বিশৃঙ্খলা?
কিন্তু আমরা চেষ্টা করি। কথা বলি। বুঝিয়ে বলি। ক্ষমা চাই। এভাবে সম্পর্ক ঠিক রাখি।
এটাও এনট্রপির বিরুদ্ধে লড়াই।
আরাশের সাথে সম্পর্ক। সে বড় হচ্ছে। আমার থেকে দূরে যাচ্ছে। নিজের জগৎ তৈরি করছে।
এটা প্রাকৃতিক। কিন্তু আমি চেষ্টা করি তার সাথে যোগাযোগ রাখতে। কথা বলতে। বুঝতে।
রাতে ভাবলাম—সমাজও কি এনট্রপির নিয়মে চলে? যত দিন যাচ্ছে, সব কিছু আরো জটিল হচ্ছে। আরো বিভক্ত হচ্ছে।
মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ছে। পারিবারিক বন্ধন কমছে। সমাজ ভাঙছে।
কিন্তু কিছু মানুষ চেষ্টা করছে। একসাথে থাকার। সাহায্য করার। ভালোবাসার।
তারাও এনট্রপির বিরুদ্ধে লড়ছে।
আমি বুঝলাম—এনট্রপি অবধারিত। কিন্তু আত্মসমর্পণ করার দরকার নেই।
জীবন মানেই এই লড়াই। বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে। ভাঙনের বিরুদ্ধে। হতাশার বিরুদ্ধে।
আমি প্রতিদিন ঘর পরিষ্কার করব। জানি আবার নোংরা হবে। কিন্তু করব।
আমি প্রতিদিন নিজেকে গুছানোর চেষ্টা করব। জানি আবার এলোমেলো হব। কিন্তু চেষ্টা করব।
আমি প্রতিদিন ভালো থাকার চেষ্টা করব। জানি সমস্যা আসবে। কিন্তু হাল ছাড়ব না।
কারণ এই চেষ্টাটাই আমাদের মানুষ করে তোলে। এনট্রপির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসটাই আমাদের বিশেষত্ব।
মহাবিশ্ব চায় সব কিছু ছড়িয়ে দিতে। কিন্তু আমরা চাই একসাথে রাখতে।
আর এই বিরোধিতাতেই লুকিয়ে আছে জীবনের সৌন্দর্য।
একটু ভাবনা রেখে যান