“আমি ভুল করেছি।” সে ফোনের ওপাশ থেকে কাঁদছিল।
আমি কিছু বলতে পারলাম না। তিন মাস আগে যখন দেখেছিলাম ওকে অন্য কারো সাথে, তখনও এমনি নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম।
“ওটা একটা ভুল ছিল। আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
ভালোবাসি? কোন্ ভালোবাসা যা অন্য কারো বিছানায় হারিয়ে যায়?
“দেরি হয়ে গেছে।” আমি ফোন রেখে দিলাম।
মা তখন অসুস্থ। কিডনির সমস্যা, প্রতিদিন হাসপাতাল। আমি একা সামলাতে পারছিলাম না। ভাই আলাদা, বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। পাশে শুধু হ্যাপি – ওই বিশ্বাসঘাতকের সবচেয়ে ভাল বন্ধু।
“আমি তোমাদের দেখাশোনা করতে পারি।” হ্যাপি একদিন বলেছিল। “আন্টি আমাকে মেয়ের মতো দেখেন।”
আমি তখন ভেবেছিলাম – এটা কৃতজ্ঞতা নাকি প্রয়োজন? হ্যাপি ভাল মেয়ে, যত্নশীল। কিন্তু প্রেম? সেই জায়গাটা শূন্য।
“তোর সাথে হ্যাপির বিয়ে দিলে কেমন হয়?” মা একদিন বললেন। “মেয়েটা আমাদের পরিবারের মতো। আর তুইও একা থেকো না।”
একা? আমি কি সত্যিই একা? নাকি বিশ্বাসঘাতকতার ধাক্কায় নিজেকে একা মনে করছি?
হ্যাপি যখন প্রস্তাবের কথা শুনল, কিছুই বলল না। কিন্তু চোখে দেখলাম একধরনের দুঃখ – যেন সে জানে এই বিয়ে প্রেমের নয়, প্রয়োজনের।
“আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাস না।” বিয়ের আগে একদিন বলেছিল। “কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি চেষ্টা করব তোমাকে খুশি রাখতে।”
আমি কী উত্তর দিয়েছিলাম মনে নেই। হয়তো কিছুই বলিনি।
বিয়ের দিন আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হয়েছিল – এক ভাঙা মানুষ নতুন করে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছে। প্রেম যেখানে মারা গিয়েছে, সেখানে কী বেড়ে উঠতে পারে?
হ্যাপি সত্যিই ভাল স্ত্রী। মার সেবা করেছে আমার চেয়ে ভাল। আরাশের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু রাতের নীরবতায় যখন পাশে শুয়ে থাকি, মনে হয় দুজনেই জানি – এই সংসার দাঁড়িয়ে আছে কৃতজ্ঞতা আর দায়বদ্ধতার উপর, ভালোবাসার উপর না।
“তুমি কি আমাকে ভালোবাসতে পার?” একদিন হ্যাপি জিজ্ঞেস করেছিল।
আমি বলেছিলাম, “আমি চেষ্টা করি।”
চেষ্টা। কত ভয়ানক একটা শব্দ। ভালোবাসা কি চেষ্টার বিষয়?
মা মারা যাওয়ার পর হ্যাপি আরো বেশি যত্ন নিতে শুরু করেছে আমার। যেন সে বুঝতে পেরেছে, এখন আমার তার আরো বেশি প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজন আর ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য কী?
সেদিন রাস্তায় হঠাৎ দেখা। সেই বিশ্বাসঘাতক। পাশে তার স্বামী, হাতে একটা বাচ্চা। সে দেখেই চোখ নামিয়ে নিল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। অদ্ভুত লাগল – যে মানুষটি একদিন আমার হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল, আজ তার দিকে তাকিয়েও কিছু অনুভব করলাম না। না রাগ, না কষ্ট। কিছুই না।
এই না অনুভব করাটাই কি আমার সবচেয়ে বড় পরাজয়?
সেদিন রাতে হ্যাপি জিজ্ঞেস করেছিল, “কেমন লাগছে?”
“কী?”
“আমাদের জীবন।”
দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলাম, “শান্তিপূর্ণ।”
“শুধু শান্তিপূর্ণ?” তার চোখে প্রশ্ন।
“আর কী চাই?”
কিন্তু রাতে জেগে থেকে ভাবি – শান্তি আর খুশি কি এক? আমি কি শান্তিতে আছি, নাকি আত্মসমর্পণ করেছি?
হ্যাপি ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর মুখে এক ধরনের তৃপ্তি। সে খুশি। আমার জন্য, আরাশের জন্য, এই সংসারের জন্য।
কিন্তু আমি? আমি কি খুশি, নাকি শুধু অভ্যস্ত?
মাঝে মাঝে ভাবি – জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ বলে কিছু আছে কি? নাকি আমরা প্রথম আঘাতের পরেই আত্মসমর্পণ করে দিই, আর বাকি জীবন কাটিয়ে দিই এক নিরাপদ নিষ্প্রাণতায়?
আয়নায় নিজেকে দেখি। সাতত্রিশ বছরের এক মানুষ, যার চোখে আর স্বপ্ন নেই, আছে শুধু একধরনের গ্রহণযোগ্যতা। আমি জীবনকে মেনে নিয়েছি, জয় করিনি।
এই মেনে নেওয়াটাই কি আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়?
একটু ভাবনা রেখে যান