ব্লগ

“বিয়ে কবে?” এর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আমার বিয়ে হয়ে গেছে ১৫ বছর। আরাশের বয়স ১১ বছর। কিন্তু তবুও আত্মীয়রা জিজ্ঞেস করেন, “আরাশের বিয়ে কবে?” এই প্রশ্ন শুনে আমার মাথা ঘুরে যায়। একটা ১১ বছরের বাচ্চার বিয়ে নিয়ে কথা! কিন্তু আমাদের সমাজে এটাই স্বাভাবিক। যেন বিয়ে ছাড়া জীবনের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।

এই প্রশ্নটা আমার ছোট বোনকে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করত। তার বয়স যখন ২৫, তখন থেকেই আত্মীয়রা প্রতি অনুষ্ঠানে জিজ্ঞেস করত, “বিয়ে কবে?” বোন নানা কৌশল অবলম্বন করত এই প্রশ্ন এড়ানোর জন্য।

প্রথম কৌশল – হাসি দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া। “হা হা, দেখি।” এই উত্তর দিয়ে দ্রুত টপিক পাল্টানো। কিন্তু আত্মীয়রা এত সহজে হার মানেন না।

দ্বিতীয় কৌশল – পড়ালেখা বা ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ততার দোহাই। “এখন পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত।” কিন্তু এই অজুহাতও একটা নির্দিষ্ট সময় পর কাজ করে না।

তৃতীয় কৌশল – পাল্টা প্রশ্ন। “আপনার ছেলের চাকরি হল?” এভাবে প্রসঙ্গ পাল্টানো। কিন্তু ধূর্ত আত্মীয়রা আবার ফিরে আসেন মূল প্রশ্নে।

চতুর্থ কৌশল – দার্শনিক হয়ে যাওয়া। “বিয়ে তো ভাগ্যের ব্যাপার।” কিন্তু এতে আত্মীয়রা আরো উৎসাহী হন। “ভাগ্য তো চেষ্টা করলেই আসে।”

আমার বোন সবচেয়ে কার্যকর কৌশল খুঁজে পেয়েছিল – এই প্রশ্নকারী আত্মীয়দের এড়িয়ে চলা। যে অনুষ্ঠানে তারা আসবেন, সেখানে না যাওয়া। কিন্তু এটাও চিরকাল সম্ভব নয়।

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমাদের সমাজে বিয়ে ছাড়া আর কিছু নিয়ে কথা হয় না? কেন সবাই সবার ব্যক্তিগত জীবনের বিচারক?”

এই “বিয়ে কবে?” প্রশ্নের পেছনে আছে আমাদের সমাজের একটা গভীর বিশ্বাস। বিয়ে মানেই জীবনের সাফল্য। বিয়ে না হলে জীবন অসম্পূর্ণ।

কিন্তু এই প্রশ্নটা কতটা ক্ষতিকর, সেটা প্রশ্নকারীরা বোঝেন না। একজন অবিবাহিত মানুষের কাছে এটা একটা তীরের মতো বিঁধে যায়। যেন তার জীবনে কিছু ভুল আছে।

আরাশের একটা বন্ধু আছে, তার বোন ৩০ বছর বয়সেও অবিবাহিত। সে একটা ভালো চাকরি করে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পরিবার তার জন্য চিন্তিত। কারণ বিয়ে হয়নি।

এই সমাজিক চাপ কতটা অন্যায়, সেটা আমি নিজের বোনের অভিজ্ঞতা থেকে জানি। সে প্রতিটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যেত ভয়ে। জানত যে অবশ্যই এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।

আমি যখন অবিবাহিত ছিলাম, তখনও এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে চাপটা একটু কম। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই চাপ অসহনীয়।

হ্যাপির সাথে বিয়ের পর ভেবেছিলাম এই প্রশ্ন থেকে মুক্তি পেয়েছি। কিন্তু না। তখন শুরু হল, “বাচ্চা কবে?” একটা প্রশ্নের পর আরেকটা প্রশ্ন।

এখন আরাশের বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন। যেন জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যই হল বিয়ে-শাদি করা। পড়ালেখা, ক্যারিয়ার, স্বপ্ন – এসব কিছুই গৌণ।

আজকাল যখন কেউ আরাশের বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করে, আমি বলি, “সে এখনও বাচ্চা। আগে তাকে মানুষ হতে দিন।” কিন্তু এই উত্তরও সবাইকে সন্তুষ্ট করে না।

কিছু আত্মীয় বলেন, “ছোটবেলা থেকেই প্রস্তুতি নিতে হয়।” এই কথা শুনে আমার রক্ত গরম হয়ে যায়। ১১ বছরের বাচ্চার বিয়ের প্রস্তুতি!

আমি আরাশকে বলেছি, “তুমি যখন বড় হবে, তখন এমন কিছু মানুষ তোমাকে প্রশ্ন করবে যেগুলোর উত্তর দেওয়া জরুরি নয়। শিখে রাখো কীভাবে ভদ্রভাবে এড়িয়ে যেতে হয়।”

হয়তো একদিন আমাদের সমাজ পরিবর্তন হবে। মানুষ বুঝবে যে বিয়ে একটা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এটা নিয়ে অন্যদের প্রশ্ন করার অধিকার নেই।

কিন্তু সেই দিন পর্যন্ত আমাদের শিখতে হবে কীভাবে এই প্রশ্নগুলোর বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করতে হয়। কীভাবে ভদ্রভাবে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে বলতে হয় – “এটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়।”

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *