গত সপ্তাহে একদিন হিসাব করে দেখলাম – সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমি কত মানুষের সাথে কথা বলেছি।
সকালে চায়ের দোকানে দোকানদারের সাথে কথা বলেছি – “দুই কাপ চা দেন।”
বাসে কন্ডাক্টরের সাথে – “গুলশান যাব।”
অফিসে সহকর্মীদের সাথে – “ফাইলটা কোথায়?”
দুপুরে হোটেলে – “একটা ভাত দেন।”
সন্ধ্যায় আরাশের সাথে – “পড়া করেছ?”
রাতে হ্যাপির সাথে – “কাল কি রান্না হবে?”
মোট আঠারো জনের সাথে কথা বলেছি। একশ বিশটি বাক্য বলেছি।
কিন্তু হঠাৎ একটা প্রশ্ন মনে এলো – এই কথাগুলোর মধ্যে কয়টা সত্যিকারের কথোপকথন ছিল?
একটাও না।
সবই ছিল লেনদেনের কথা। প্রয়োজনের কথা। রুটিনের কথা।
কিন্তু আমি যেসব কথা বলতে চেয়েছি, সেগুলো কি বলেছি?
চায়ের দোকানদারকে বলতে চেয়েছিলাম, “ভাই, জীবনটা কত কঠিন হয়ে গেছে।” কিন্তু বলেছি, “দুই কাপ চা দেন।”
বাসের কন্ডাক্টরকে বলতে চেয়েছিলাম, “এই শহরে আমি কত একা।” কিন্তু বলেছি, “গুলশান যাব।”
সহকর্মীকে বলতে চেয়েছিলাম, “আমি কাজ হারানোর ভয়ে ভুগি।” কিন্তু বলেছি, “ফাইলটা কোথায়?”
আরাশকে বলতে চেয়েছিলাম, “বাবা তোমাকে কত ভালোবাসে।” কিন্তু বলেছি, “পড়া করেছ?”
হ্যাপিকে বলতে চেয়েছিলাম, “তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অংশ।” কিন্তু বলেছি, “কাল কি রান্না হবে?”
তাহলে আমি কি সত্যিকারে কোনো কথা বলেছি?
নাকি সারাদিন শুধু শব্দ বিনিময় করেছি?
ছোটবেলায় একটা বোবা মেয়ে ছিল পাড়ায়। সে কখনো কথা বলত না। কিন্তু তার চোখ দিয়ে এত কিছু বলত যে আমরা সবাই বুঝতে পারতাম। তার নিঃশব্দতার মধ্যে ছিল অসংখ্য কথা।
আর আমি? আমি প্রতিদিন হাজারো শব্দ বলি, কিন্তু একটা কথাও বলি না।
আমার কি সত্যিকারের কণ্ঠস্বর আছে? নাকি আমি একটা রেকর্ড প্লেয়ার যেটা শুধু পূর্বনির্ধারিত বাক্য বাজায়?
অফিসে সাহেব যখন জিজ্ঞেস করেন, “কেমন আছ?” আমি বলি, “ভালো আছি।” কিন্তু ভেতরে চিৎকার করে বলতে চাই, “আমি ভাঙছি।”
বন্ধুরা যখন বলে, “কী খবর?” আমি বলি, “কোনো খবর নেই।” কিন্তু বলতে চাই, “আমার খবর এই যে আমার কোনো খবর নেই।”
এই যে প্রতিদিন হাজারো শব্দের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখি, এটা কি বোবা হওয়া নয়?
রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবি, পৃথিবীতে কত মানুষ আমার মতো? যারা সারাদিন কথা বলে কিন্তু কিছু বলে না।
যাদের মুখে ভাষা আছে, কিন্তু হৃদয় বোবা।
যারা অন্যদের সাথে কথোপকথন করে, কিন্তু নিজের সাথে কথা বলতে ভুলে যায়।
আল্লাহ, আমি কি সত্যিকারে বোবা? নাকি আমার ভেতরে একটা কণ্ঠস্বর আছে যেটা শুধু আমি শুনতে পাই না?
হয়তো সত্যিকারের কথা বলা শুরু হয় সত্যিকারের নিঃশব্দতা থেকে।
একটু ভাবনা রেখে যান