“একটু পড়ে ঘুমাবো।” রাত ১১টায় বিছানায় শুয়ে বইটা খুলি। আজ অন্তত ২০ পাতা পড়ব। তারপর শান্তিতে ঘুমিয়ে যাব। এমন সুন্দর একটা পরিকল্পনা। কিন্তু বই আর আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত খেলা চলে প্রতি রাতে।
প্রথম পাতা পড়তে পড়তে মনোযোগ ভালো। দ্বিতীয় পাতায় একটু চোখ জড়িয়ে আসে। তৃতীয় পাতায় লাইনগুলো ঝাপসা লাগতে থাকে। চতুর্থ পাতায় গিয়ে আমি বুঝি বিপদে পড়েছি।
হ্যাপি পাশে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি বইয়ের সাথে একা যুদ্ধ করছি। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, কিন্তু মনে বলি “আরো দুই পাতা।” এই আরো দুই পাতা কখনো শেষ হয় না।
বই বুকের উপর রেখে চোখ বন্ধ করি। শুধু দু’মিনিটের জন্য। তারপর আবার পড়ব। কিন্তু এই দু’মিনিট হয়ে যায় পুরো রাত। সকালে উঠে দেখি বই এখনো বুকের উপর।
কত রাত এভাবে কেটেছে। বই নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া। সকালে উঠে বইটা খুঁজে বিছানায় পেয়েছি। কখনো মেঝেতে পড়ে আছে। কখনো আমার পেটের উপর।
একবার একটা হার্ডকভার বই নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাতে বইটা আমার মুখের উপর পড়ে নাক ব্যথা করেছিল। সেদিন বুঝেছিলাম বই পড়তে গিয়ে ঘুমানোর বিপদ।
আরাশ একদিন বলেছিল, “আব্বু, আপনার বই কেন বিছানায় পড়ে থাকে?” আমি বলেছিলাম, “পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছি।” সে অবাক হয়ে বলেছিল, “বই পড়লে ঘুম আসে?”
সত্যিই তো। বইয়ে এমন কী জাদু আছে যে পড়তে শুরু করলেই ঘুম আসে? দিনে যখন পড়ি, তখন তো ঘুম আসে না। রাতে বিছানায় শুলেই এই অবস্থা।
অনেক সময় মনে হয় আমি বই পড়ার ছল করে আসলে ঘুমাতে যাই। “পড়ে ঘুমাব” বলে নিজেকে এক ধরনের নৈতিক সান্ত্বনা দিই। যেন পড়ার চেষ্টা করেছি।
কিন্তু সকালে বইটা যখন একই পাতায় খোলা থাকে, তখন বুঝি আমি আসলে কিছুই পড়িনি। শুধু পড়ার ভান করে ঘুমিয়ে পড়েছি।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমি বই পড়তে পারি না? কেন শুধু ঘুমিয়ে পড়ি?” মনে হয় উত্তর আসছে – “তুমি ক্লান্ত।”
সত্যিই হয়তো আমি খুব ক্লান্ত। সারাদিনের কাজের পর রাতে পড়ার শক্তি থাকে না। কিন্তু তবুও বই হাতে নিই। কারণ পড়ার ইচ্ছা আছে।
হ্যাপি বলে, “তুমি দিনে পড়তে পার। রাতে ঘুমাও।” কিন্তু দিনে কোথায় সময়? অফিস, ঘর, সংসার – সব সামলে রাতেই তো একটু সময় পাই।
একবার বিছানার পাশে টেবিল রেখে বসে পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু বসে বসে পড়তে পারিনি। অস্বস্তি লেগেছে। শুয়ে পড়াই স্বাভাবিক লেগেছে।
অনেক রাত শুয়ে শুয়ে ভেবেছি, “আজ বই না নিয়ে সরাসরি ঘুমাই।” কিন্তু বই ছাড়া ঘুমানো অপূর্ণ লাগে। যেন কিছু একটা বাকি থেকে যায়।
হয়তো এটাই আমার পড়ার পদ্ধতি। বই নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া। কিছু না পড়লেও বইয়ের সাহচর্য পেয়েছি। হয়তো ঘুমের মধ্যে কিছু শব্দ মস্তিষ্কে ঢুকে গেছে।
কিন্তু এভাবে তো কোনো বই শেষ করা যাবে না। এভাবে তো জ্ঞানার্জন হবে না। তবুও প্রতি রাতে আবার বই নিয়ে শুই। “আজ অন্তত ১০ পাতা পড়ব।”
একটু ভাবনা রেখে যান