ব্লগ

স্মার্ট ঘরে বোকা মানুষ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল জামিউরের নতুন বাড়িতে গেলাম। সবকিছু স্মার্ট। দরজা, বাতি, ফ্যান, এমনকি টয়লেটও।

“আলেক্সা, বাতি জ্বালাও,” বলতেই বাতি জ্বলে উঠল।

আমি অবাক। কিন্তু আরাশ আরও অবাক।

“কাকু, এটা কীভাবে হয়?” সে জিজ্ঞেস করল।

জামিউর গর্বের সাথে বুঝিয়ে দিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভয়েস কমান্ড, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ।

আমি শুনছিলাম। কিন্তু মনে হচ্ছিল আমি কোনো অপরিচিত জগতে চলে এসেছি।

বাথরুমে গেলাম। কল ছোঁয়ার আগেই পানি বেরিয়ে এল। আমি চমকে গেলাম।

ফিরে এসে জামিউরকে বললাম, “এসব কিছু বুঝি না।”

সে হাসল। “অভ্যাস হয়ে যাবে।”

কিন্তু আমার প্রশ্ন – অভ্যাস হতে চাই কি?

আমাদের সাধারণ ঘরে সবকিছু হাত দিয়ে করতে হয়। সুইচ চাপতে হয়। দরজা খুলতে হয়। নিজের ইচ্ছামতো সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

এই স্মার্ট ঘরে মনে হলো আমি অতিথি। ঘরটা জানে কী করতে হবে। আমি জানি না।

আরাশ বলল, “বাবা, আমাদের ঘরও এমন হবে?”

আমি বললাম, “তুমি চাও?”

সে ভেবে বলল, “জানি না। এখানে সবকিছু অদ্ভুত লাগছে।”

ঠিক কথা। অদ্ভুত লাগার কারণ আমরা অভ্যস্ত নই। কিন্তু আরেকটা কারণ আছে – আমাদের মনে হয় আমরা ঘরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি।

ঘর আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা ঘর নিয়ন্ত্রণ করছি না।

জামিউর বলল, “এখানে সবকিছু সহজ। কোনো কিছু মনে রাখতে হয় না।”

কিন্তু আমি ভাবি – মনে রাখাটাই তো মানুষের বৈশিষ্ট্য। আমরা যদি কিছু মনে না রাখি, তাহলে আমাদের মগজের কী দরকার?

আমাদের ঘরে আমি জানি কোন সুইচ কোনটা। কোথায় কী রাখা আছে। সবকিছু আমার নিয়ন্ত্রণে।

এই স্মার্ট ঘরে আমি হারিয়ে যাচ্ছি। যন্ত্র সব জানে। আমি কিছু জানি না।

সবচেয়ে বড় কথা – এই ঘরে থাকতে হলে প্রযুক্তি শিখতে হবে। প্রতিদিন নতুন নতুন অ্যাপ। নতুন নতুন কমান্ড।

আমার মতো মানুষের পক্ষে এত কিছু শেখা সম্ভব কি?

আমি জামিউরকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার বাবা-মা এসব ব্যবহার করতে পারেন?”

সে একটু ইতস্তত করে বলল, “ওরা এখনো পুরনো পদ্ধতিতে চালান।”

অর্থাৎ এই স্মার্ট ঘর সবার জন্য নয়। শুধু তরুণদের জন্য।

তাহলে আমাদের মতো প্রজন্ম কী করবে? আমরা কি পিছিয়ে পড়ব?

আমি লক্ষ করলাম – এই ঘরে সবকিছু যন্ত্র নির্ভর। যন্ত্র নষ্ট হলে কিছুই করা যাবে না।

আমাদের সাধারণ ঘরে একটা সুইচ নষ্ট হলে হাত দিয়ে বাতি জ্বালাতে পারি। কিন্তু এখানে?

প্রযুক্তি আমাদের সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু নির্ভরশীলও করেছে।

হ্যাপি বলল, “এসব ব্যয়বহুল। আমাদের সাধ্যের বাইরে।”

আমি বললাম, “শুধু টাকার কথা না। মানসিক প্রস্তুতিরও কথা।”

আমি এই সব স্মার্ট যন্ত্রের সামনে নিজেকে বোকা মনে করি। অশিক্ষিত মনে করি।

কিন্তু আসলে কি আমি বোকা? নাকি যুগের সাথে তাল মিলাতে পারছি না?

আমি ভাবি – স্মার্ট ঘর মানুষকে স্মার্ট করে, নাকি অলস করে?

যখন সবকিছু যন্ত্র করে দেয়, তখন মানুষের মগজ কাজ করে না। মানুষ ভুলে যায় কীভাবে কাজ করতে হয়।

আমি আরাশকে বলেছি – প্রযুক্তি ব্যবহার করো, কিন্তু নির্ভরশীল হয়ো না।

যন্ত্র ছাড়াও যেন তুমি সবকিছু করতে পারো।

কারণ স্মার্ট ঘর তোমার জীবন সহজ করতে পারে। কিন্তু স্মার্ট মানুষ বানাতে পারে না।

স্মার্ট মানুষ হতে হলে নিজের বুদ্ধি ব্যবহার করতে হবে। যন্ত্রের বুদ্ধির ওপর নির্ভর করলে চলবে না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *