“নানুর পা ছোঁও।” হ্যাপি আরাশকে বলল। আমরা ঈদের দিন নানুর বাড়ি এসেছি। আরাশ একটু দ্বিধা করে নানুর পায়ের কাছে গিয়ে মাথা নিচু করল। নানু হাত দিয়ে আরাশের মাথায় স্পর্শ করে বললেন, “দীর্ঘজীবী হও।” এই পুরো দৃশ্যটা দেখে আমার মনে হল যেন একটা নাটকের মঞ্চায়ন হচ্ছে।
ছোটবেলায় আমাকেও এমন করতে হত। প্রতিটি ঈদে, প্রতিটি পূজায়, প্রতিটি বিশেষ অনুষ্ঠানে সব বড়দের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিতে হত। দাদা, নানা, চাচা, মামা, বড় কাকা – সবার পা ছোঁয়ার একটা নির্দিষ্ট ক্রম ছিল।
এই আশীর্বাদ নেওয়ার ব্যাপারটা কি সত্যিই আন্তরিক? নাকি শুধুই একটা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা? আরাশের মুখে দেখি একই প্রশ্নের ছায়া। সে করছে কারণ আমরা বলেছি, কিন্তু বুঝে করছে না।
নানু আরাশকে আশীর্বাদ দিয়ে একশো টাকা দিলেন। আরাশের চোখে খুশির ঝিলিক। আমি বুঝলাম তার কাছে এই পুরো প্রক্রিয়াটা একটা লেনদেন মনে হচ্ছে। পা ছুঁয়েছি, টাকা পেয়েছি।
আমার ছোটবেলায়ও এমনই ছিল। বড়দের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদের সাথে পেতাম এক-দুই টাকা। তখন সেই টাকাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় আনন্দের উৎস। আশীর্বাদের চেয়ে টাকাই ছিল মূল লক্ষ্য।
কিন্তু এখন মনে হয় এই প্রথায় একটা গভীর অর্থ আছে। বড়দের সম্মান করা, তাদের অভিজ্ঞতাকে স্বীকার করা, তাদের কাছে আশীর্বাদ চাওয়া – এসব কিছুর মধ্যে একটা সুন্দর ভাবনা আছে।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “এই যে প্রথাগুলো আমরা পালন করি, এগুলো কি আত্মার খোরাক নাকি শুধুই সামাজিক বাধ্যবাধকতা?”
নানু আরাশকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ভালো থেকো বাবা। পড়ালেখা করো।” এই সাধারণ কথাগুলোর মধ্যেও একটা আন্তরিকতা ছিল। নানুর চোখে আরাশের জন্য সত্যিকারের ভালোবাসা।
কিন্তু আরাশ কি সেই ভালোবাসা অনুভব করতে পারল? নাকি তার কাছে এটা শুধুই একটা রীতি মেনে চলা?
আমি নিজেও নানুর পা ছুঁলাম। ৩৯ বছর বয়সে এসেও এই কাজটা করতে একটু অস্বস্তি লাগে। মনে হয় আমি বড় হয়ে গেছি এসব করার জন্য। কিন্তু সামাজিকভাবে এটা প্রত্যাশিত।
নানু আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, “সবসময় ভালো থেকো।” তার এই আশীর্বাদে একটা উষ্ণতা অনুভব করলাম। হয়তো এই প্রথার মধ্যে আসলেই কোনো শক্তি আছে।
বাড়ি ফেরার পথে আরাশ বলল, “আব্বু, আমি কেন সবার পা ছুঁই?” আমি বললাম, “এটা আমাদের সংস্কৃতি। বড়দের সম্মান করার উপায়।” কিন্তু আমার নিজের কাছেও এই উত্তর সন্তোষজনক মনে হল না।
হ্যাপি বলল, “আরাশ যদি এটা বুঝে করে তাহলে ভালো। নাহলে শুধু একটা অভ্যাস হয়ে যাবে।”
সত্যিই তো। আমার নিজের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ছোটবেলায় যেটা আন্তরিকতার সাথে করতাম, বড় হওয়ার পর সেটা হয়ে গেছে যান্ত্রিক।
কিন্তু এই প্রথাটুকু বাঁচিয়ে রাখা কি দরকার? এর মধ্যে কি এমন কোনো মূল্যবোধ আছে যেটা আরাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
হয়তো আছে। হয়তো এই সামান্য প্রথার মধ্যে লুকিয়ে আছে বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, পারিবারিক বন্ধনের উষ্ণতা, প্রজন্মের মধ্যে ভালোবাসার সেতুবন্ধন।
আরাশ যদি এই প্রথাটা শুধু টাকার জন্য করে, তাহলে সেটা ভুল। কিন্তু যদি সে বুঝতে পারে এর পেছনের ভালোবাসা, তাহলে এটা তার জীবনে একটা সুন্দর ঐতিহ্য হয়ে উঠবে।
একটু ভাবনা রেখে যান