চোখ খোলো।
ঘড়িতে সাতটা।
কিন্তু তুমি কোথায়?
শরীর বিছানায়। মন কোথায়?
অফিসে। রিপোর্টে। বসের কথায়।
তুমি এখানে নেই।
এটাই সবচেয়ে ভয়ানক সত্য।
তুমি বেঁচে আছো।
কিন্তু বাঁচছো না।
দাঁত মাজো।
মন কোথায়?
গতকালে। “কেন ওভাবে বললাম?”
আগামীকালে। “অন্যভাবে বললে?”
হাতে ব্রাশ। মুখে ফেনা।
কিন্তু তুমি এখানে নেই।
নাশতার টেবিল।
ফোন খোলো।
কারো চাকরি পদোন্নতি। কারো বিদেশ। কার ছেলে প্রথম।
রুটি-ডিম খাচ্ছো।
কেমন লাগছে?
জানো না।
কারণ খাচ্ছো না।
মুখ চিবাচ্ছে। তুমি নেই।
কেউ বলছে — “বারান্দার গোলাপটা দেখেছ?”
“কোনটা?”
“সকালে ফুটেছে। লাল।”
“আচ্ছা।”
দেখোনি।
কারণ দেখছিলে না।
চোখ খোলা ছিল। কিন্তু তুমি অন্ধ ছিলে।
এটা জেনে রাখো।
বেশিরভাগ মানুষ এভাবেই বাঁচে।
চোখ খোলা। কিন্তু অন্ধ।
কান খোলা। কিন্তু বধির।
শরীর এখানে। কিন্তু তুমি অন্য কোথাও।
গাড়িতে বসে আছো।
জ্যাম।
ভাবছো — দশ মিনিট আগে বের হলে পারতাম।
পাঁচ বছর আগে সেই চাকরিটা নিলে এই রাস্তায় থাকতাম না।
পাশের গাড়িতে গান। রিকশাঅলা হাসছে। চা-বিক্রেতা চা ঢালছে।
দেখছো না। শুনছো না।
কারণ তুমি পাঁচ বছর আগে আছো।
দশ মিনিট আগে আছো।
এখানে নেই।
অফিসে ডেস্ক।
কেউ জিজ্ঞেস করে — “কেমন আছ?”
“ভালো। তুমি?”
“ভালো।”
মিথ্যা।
তুমি না এখানে, না সেখানে।
তুমি ভূত।
দুপুর। খাবার।
সবাই হাসছে।
তুমিও হাসছো।
কী হাসলে?
জানো না। শোনোনি।
মুখ হাসছিল। তুমি ছিলে না।
খাবার শেষ।
কী খেলে?
মনে নেই।
কারণ খাওনি।
মুখ খেয়েছে। তুমি অনুপস্থিত।
সন্ধ্যায় বাড়ি।
টিভি চালু।
খবরে অর্থনীতি। রাজনীতি। দুর্ঘটনা।
দেখছো না।
ভাবছো পাঁচ বছর পরের কথা।
চাকরি থাকবে? খরচ হবে? বুড়ো হলে?
এটাই নরক।
এখন না থাকা।
অতীতে ভাসা।
ভবিষ্যতে ডুবে থাকা।
এবং বর্তমান — যেখানে জীবন — সেটা মিস করা।
একটা শিশু দৌড়ে আসে।
“বাবা শোনো, আজ স্কুলে—”
“পরে বল। ক্লান্ত।”
চলে যায়।
এটাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর।
শিশু এসেছিল এখানে।
এই মুহূর্তে।
তুমি ছিলে ভবিষ্যতে।
“পরে বল।”
কিন্তু পরে মানে কখনো না।
খাবার টেবিল। তিনজন।
একজন বলছে পেঁয়াজের দাম।
“হুম।”
একজন বলছে বন্ধুর কথা।
“আচ্ছা।”
তারা এখানে।
তুমি কোথায়?
শিশু জিজ্ঞেস করে —
“বাবা, তুমি এখানে আছ?”
“আছি তো। দেখছ না?”
“দেখছি। কিন্তু তুমি কোথায়?”
এই প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দেহ এখানে।
কিন্তু তুমি?
রাতে বিছানা।
কেউ জিজ্ঞেস করে — “আজকের দিনটা কেমন ছিল?”
“ভালো।”
“কী করলে?”
মনে নেই।
সকালের চায়ের স্বাদ? দুপুরের রোদ? সন্ধ্যার বাতাস?
কিছু মনে নেই।
কারণ ছিলে না।
শরীর করেছে।
মন ভেসে গেছে।
এবং মিলন হয়নি।
মিলন ছাড়া স্মৃতি তৈরি হয় না।
কেউ বলে —
“তুমি এখানে নেই।”
“আছি।”
“দেহ আছে। তুমি কোথায়?”
উত্তর দিতে পারো না।
কারণ জানো না।
হয়তো গতকালে।
হয়তো আগামীকালে।
কিন্তু আজ — এখন — এই মুহূর্তে?
নেই।
এবং সবচেয়ে ভয়ানক কথা —
যারা তোমার সাথে আছে,
তারা একা।
তোমার শরীর পাশে।
কিন্তু তুমি দূরে।
একদিন বৃষ্টি হয়েছিল।
প্রথম ফোঁটা গায়ে পড়েছিল।
দাঁড়িয়ে ছিলে।
সেই মুহূর্তে সব ভুলে গিয়েছিলে।
অতীত নেই। ভবিষ্যৎ নেই।
শুধু বৃষ্টি।
শুধু তুমি।
শুধু এখন।
সেটাই জীবন।
এই মুহূর্ত।
এই এখন।
কিন্তু এরকম মুহূর্ত কত বার আসে?
বছরে একবার?
মাসে?
বা একেবারেই না?
শিশু জিজ্ঞেস করে —
“বাবা, তুমি সুখী?”
“হুম।”
“সত্যি?”
“হুম।”
“তাহলে হাসো না কেন?”
“হাসি তো।”
“না। মুখ হাসে। চোখ হাসে না।”
শিশু দেখতে পায়।
কারণ শিশু এখানে থাকে।
এই মুহূর্তে।
শিশু বলে —
“তুমি কোথায় থাকো?”
“তোর সামনেই তো।”
“না। তুমি দূরে কোথাও। আমরা তোমাকে ডাকি। তুমি শোনো না।”
এটা সত্য।
তুমি শোনো না।
কারণ তুমি এখানে নেই।
এবং সবচেয়ে নিষ্ঠুর —
“মা কাঁদে কখনো কখনো। রাতে।”
কেন?
কারণ তুমি থাকলেও নেই।
শরীর পাশে।
কিন্তু তুমি অনুপস্থিত।
শিশু বলে —
“তোমার সাথে থাকলেও তোমাকে একা লাগে?”
উত্তর দিতে পারো না।
কারণ উত্তর জানো না।
শিশু বলে —
“আমরা তো আছি। আমরা ছোট হলেও আমরা তো আছি।”
এটা শুনো।
তারা আছে।
কিন্তু তুমি নেই।
তাই তাদের থাকা অর্থহীন।
একদিন সকাল।
চা বানাও।
এবার ফোন তোলো না।
কাপটা দুই হাতে ধরো।
গরম অনুভব করো।
স্বাদ নাও। মিষ্টি।
এই প্রথম।
তুমি এখানে।
বারান্দায় যাও।
গোলাপ দেখো। লাল। পাপড়ি ভেজা।
দাঁড়িয়ে থাকো।
শিশু পাশে আসে। কিছু বলে না। শুধু দাঁড়ায়।
“কী দেখছিস?”
“তুমি কী দেখছ?”
“ফুল।”
“আর?”
“জানি না। তুই বল।”
“সকাল। আকাশ। তুমি। আমি।”
এটাই জীবন।
এই মুহূর্ত।
শিশু বলে —
“বাবা, তুমি এখন এখানে আছ?”
“আছি।”
“সত্যি?”
“সত্যি।”
“ভালো লাগছে। থেকো।”
থেকো।
এটাই সবচেয়ে বড় উপহার।
এখানে থাকা।
অফিসে চা খেতে যাও।
জানালার পাশে বসো।
চুমুক দাও। গরম। জিভ পুড়ে যায়।
ব্যথা অনুভব করো।
এটাই জীবন।
এই ব্যথা।
এই গরম।
এই এখন।
জানালা দিয়ে তাকাও।
রাস্তা। মানুষ। রিকশা। একটা কুকুর রোদে শুয়ে।
দেখো।
শুধু দেখো।
অতীত না। ভবিষ্যৎ না।
শুধু এই মুহূর্ত।
ফিরে এসে কাজ করো।
টাইপ করো।
শব্দ শোনো। ক্লিক ক্লিক ক্লিক।
ফোনে বার্তা আসে।
পড়ো না। পরে পড়বে।
এখন — এখানে — এই কাজ।
বাড়ি ফিরছো।
গাড়ি দাঁড়িয়ে।
জানালা খোলো।
বাতাস ঢোকে। গরম। ধুলো।
কিন্তু অনুভব করো।
বাড়ি পৌঁছো।
শিশু দৌড়ে আসে। জড়িয়ে ধরে।
এবার অনুভব করো।
উষ্ণতা। গন্ধ। সাবান। ঘাম।
এটাই জীবন।
এই জড়িয়ে ধরা।
এই গন্ধ।
এই এখন।
রাতের খাবার।
শিশু বলছে — “আজ স্কুলে—”
শোনো। চোখে চোখ রাখো।
কেউ বলছে — “আজ বাজারে—”
শোনো। মাথা নাড়ো।
খাবার শেষ।
কী খেলে জানো।
ভাত। মাছ। ঝাল ছিল।
জিজ্ঞেস করে — “কেমন লাগল?”
“ভালো। ঝাল ছিল।”
হাসে। “ঝাল না হলে তো তুমি খাও না।”
এই ছোট মুহূর্ত।
এটাই জীবন।
বিছানায়।
কেউ বলে — “আজ ভালো ছিল।”
“কী?”
“তুমি। এখানে ছিলে।”
এটাই সব।
এখানে থাকা।
“কাল?”
“জানি না। থাকার চেষ্টা করব।”
এটাই যথেষ্ট।
চেষ্টা।
জানো না কাল পারবে কিনা।
কিন্তু আজ পেরেছ।
এবং আজ — এখন — এটাই যথেষ্ট।
তাই শোনো।
এখন কী করছ?
এই লাইন পড়ছ।
ঠিক আছে।
তাহলে পড়ো।
অতীত ভুলে যাও। ভবিষ্যৎ ভুলে যাও।
এই শব্দগুলো পড়ো।
এই শ্বাস নাও।
এই মুহূর্তে শ্বাস নাও।
এবং এই এখনে থাকো।
পাঁচ সেকেন্ড।
এটাই শুরু।
এটাই যাত্রা।
এটাই জীবন।
বেশিরভাগ সময় তুমি এখানে থাকবে না।
মন ভেসে যাবে।
এটা স্বাভাবিক।
কিন্তু মাঝে মাঝে —
কিছু মুহূর্ত —
এখানে থাকবে।
এবং এই কিছু মুহূর্তই —
এগুলোই আসল জীবন।
বাকি সব ঘুম।
একটু ভাবনা রেখে যান