ব্লগ

বহুবিবাহের বিকৃত রূপ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গত সপ্তাহে এলাকার মোক্তার সাহেবের দ্বিতীয় বিয়ের দাওয়াত পেলাম। ৫৫ বছর বয়সে ২৫ বছরের একটা মেয়েকে বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রী আর তিনটা সন্তান আছে।

দাওয়াতে গিয়ে দেখি মোক্তার সাহেব গর্বের সাথে বলছেন, “আল্লাহ পুরুষদের চারটা বিয়ে করার অধিকার দিয়েছেন। আমি তো মাত্র দুইটা করলাম।”

পাশে দাঁড়ানো একজন জিজ্ঞেস করল, “প্রথম বউয়ের অনুমতি নিয়েছেন?”

মোক্তার সাহেব হেসে বলল, “অনুমতির কী দরকার? ইসলামে পুরুষের অধিকার।”

আমার মন খারাপ হয়ে গেল। এটাই কি ইসলামী বিধান?

বাসায় ফিরে রাতে কুরআন খুলে দেখলাম বহুবিবাহের আয়াত (নিসা ৪:৩): “যদি তোমরা ভয় করো যে ইয়াতিম মেয়েদের সাথে ন্যায়বিচার করতে পারবে, তাহলে বিয়ে করো যাদের তোমাদের ভালো লাগে – দুই, তিন, বা চার। কিন্তু যদি ভয় করো যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে একটিই।”

এই আয়াতের প্রেক্ষাপট ছিল উহুদ যুদ্ধের পর। অনেক পুরুষ শহীদ হয়ে গেছেন। বিধবা ও ইয়াতিম মেয়েদের দেখভালের জন্য এই অনুমতি।

মূল শর্ত ছিল “ন্যায়বিচার”। আর শেষের দিকে আল্লাহ বলেছেন (নিসা ৤:১২৯), “তোমরা স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, যতই চেষ্টা করো না কেন।”

মানে বহুবিবাহ একটি বিশেষ পরিস্থিতির জন্য, স্বাভাবিক নিয়ম নয়।

হ্যাপিকে বললাম এসব কথা। হ্যাপি বলল, “মোক্তার সাহেবের প্রথম বউকে দেখেছো? কত কষ্ট পাচ্ছেন। কিন্তু কিছু বলতে পারেন না।”

আরাশ জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, তুমি আর একটা বিয়ে করবে?”

আমি হেসে বললাম, “কেন? তোমার আম্মুতে আমার সব চাহিদা পূরণ। আরেকটা বিয়ে করার প্রয়োজন কী?”

“কিন্তু মোক্তার কাকা কেন করল?”

আমি ভেবে বললাম, “কাকার হয়তো লালসা ছিল। কিন্তু সেটাকে তিনি ধর্মের নাম দিয়েছেন।”

ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে দেখলাম রসুল (সা) এর বহুবিবাহের কারণগুলো। প্রতিটি বিবাহ ছিল সামাজিক, রাজনৈতিক বা মানবিক কারণে।

খাদিজা (রা) এর সাথে ২৫ বছর একবিবাহে কাটিয়েছেন। তাঁর জীবদ্দশায় আর কোনো বিয়ে করেননি।

অন্য বিয়েগুলো: আইশা (রা) – আবু বকর (রা) এর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করতে; হাফসা (রা) – উমর (রা) এর বিধবা মেয়ে; উম্মে সালামা (রা) – আবু সালামা (রা) এর বিধবা স্ত্রী; জয়নব বিনতে জাহশ (রা) – দত্তক পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী (সামাজিক কুসংস্কার ভাঙতে)।

কোনোটিই ব্যক্তিগত লালসার জন্য নয়।

আমি ভাবি, মোক্তার সাহেবের দ্বিতীয় বিয়ে কি এমন কোনো সামাজিক উদ্দেশ্যে? নাকি শুধু তার যৌন লালসা?

একটি ২৫ বছরের মেয়ে, যার বাবা-মা আর্থিক চাপে তাকে ৫৫ বছরের পুরুষের কাছে বিয়ে দিয়েছে। এটা কি ন্যায়বিচার?

প্রথম স্ত্রী, যিনি ৩০ বছর সংসার করেছেন, তিনটা সন্তান জন্ম দিয়েছেন, এখন তাকে নতুন স্ত্রীর সাথে ভাগাভাগি করতে হবে। তার মানসিক কষ্টের কথা কেউ ভাবে না?

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবি। যদি আমি হ্যাপির জায়গায় থাকতাম আর সে আরেকটা বিয়ে করত, তাহলে আমার কী অবস্থা হতো?

আল্লাহ যে বহুবিবাহের অনুমতি দিয়েছেন, সেটা ছিল বিশেষ পরিস্থিতির জন্য। নারীদের সহায়তার জন্য, লালসা মেটানোর জন্য নয়।

আর সবচেয়ে বড় কথা – ন্যায়বিচার। কেউ যদি দুই স্ত্রীর মধ্যে সমান ভালোবাসা, সময়, অর্থ বণ্টন করতে না পারে, তাহলে তার দ্বিতীয় বিয়ে হারাম।

আমার বিশ্বাস, যারা ধর্মের নাম করে নিজেদের লালসা পূরণ করেন, তারা ইসলামের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেন।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *