ব্লগ

বুকের ভেতর ঘূর্ণিঝড়

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

হঠাৎ করে শুরু হয়। কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই। আমি বসে আছি অফিসের চেয়ারে, একটা ইমেইল পড়ছি। স্বাভাবিক ইমেইল। কিছুই বিশেষ নয়। কিন্তু হঠাৎ মনে হয় – আমার বুকের ভেতর কেউ একটা সুইচ টিপে দিয়েছে।

প্রথমে একটা খসখস ভাব। যেন বুকের ভেতর পিঁপড়া হাঁটছে। তারপর সেই পিঁপড়াগুলো হয়ে যায় মৌমাছি। তারপর বাজপাখি। তারপর…

হার্টবিট একেবারে অন্যরকম হয়ে যায়। স্বাভাবিক ধুকধুক আর থাকে না। হয়ে যায় ঢক্-ঢ্যাং-ঢক্-ঢ্যাং। যেন হৃদপিণ্ডটা একটা ভাঙা ড্রামের মতো।

আমি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু পা দুটো কেমন লেগে যায়। মনে হয় মেঝেটা কাঁপছে। আসলে কাঁপছে নাকি আমিই কাঁপছি? বোঝা যায় না।

রিফাত জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে? খারাপ লাগছে?” আমি মুখ খুলতে চাই, কিন্তু গলা দিয়ে হাওয়া বের হয় না। যেন গলার ভেতর কেউ একটা প্লাগ ঢুকিয়ে দিয়েছে।

অক্সিজেন শেষ হয়ে যাচ্ছে। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। রুমে অক্সিজেন আছে, আমি জানি। সবাই স্বাভাবিক শ্বাস নিচ্ছে। কিন্তু আমার ফুসফুস যেন ভুলে গেছে কীভাবে অক্সিজেন নিতে হয়।

আমি জানালার কাছে যাই। মনে হয় – বাইরের হাওয়া পেলে হয়তো ভালো হবে। কিন্তু জানালা খোলার পরও একই অবস্থা। হাওয়া আছে, কিন্তু সেই হাওয়া আমার পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না।

এখন মনে হচ্ছে – আমি মারা যাব। হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। অথবা স্ট্রোক। অথবা কিডনি ফেইল। অথবা… কিছু একটা হচ্ছে। কিছু একটা খারাপ হচ্ছে।

রিফাত বলে, “হাসপাতালে যাব?” আমি মাথা নাড়াই। কিন্তু বুঝি না – হ্যাঁ নাকি না।

ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ভাবতেই মনে হয় – ডাক্তার যদি বলে কিছুই নেই? তাহলে আমি কী বলব? বলব – “ডাক্তার সাহেব, আমার মনে হচ্ছিল আমি মারা যাচ্ছি, কিন্তু আসলে কিছুই হয়নি?”

কিন্তু এটা তো “কিছুই না” নয়। এটা খুবই কিছু। এটা এমন কিছু যেটা আমাকে মনে করাচ্ছে – আমি একটা অসহায় জন্তু। যে কিনা তার নিজের শরীরের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না।

আমি বাথরুমে যাই। ঠান্ডা পানি মুখে দেই। কিন্তু পানিটা যেন গরম লাগে। সবকিছু উল্টো হয়ে গেছে। ঠান্ডা গরম, গরম ঠান্ডা।

আয়নায় নিজের মুখ দেখি। চেহারাটা একদম ফ্যাকাশে। চোখ দুটো বড় হয়ে গেছে। যেন কোনো ভূতের চেহারা।

এখন অন্য একটা ভয় আসে। মনে হয় – আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। এই যে আমার শরীর আমার কথা শুনছে না, এই যে আমার মন আমার নিয়ন্ত্রণে নেই – এটা কি পাগলামির লক্ষণ?

আমি চেষ্টা করি শান্ত হতে। গভীর শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু গভীর শ্বাস নিতে গেলেই মনে হয় – আমার ফুসফুস ফেটে যাবে।

তখন একটা অদ্ভুত কাজ করি। আমি নিজের সাথে কথা বলতে শুরু করি। মনে মনে বলি – “এটা কেবল একটা অ্যাটাক। এটা যাবে। আমি ঠিক আছি।”

কিন্তু নিজের কথাই বিশ্বাস হয় না। মনে হয় – আমি নিজেকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছি।

ধীরে ধীরে, খুব ধীরে, সেই ঘূর্ণিঝড়টা কমতে শুরু করে। হার্টবিট একটু স্বাভাবিক হয়। শ্বাস আসতে শুরু করে।

কিন্তু একটা ভয় থেকে যায়। আবার হবে কি না। কখন হবে। কোথায় হবে। এই ভয়টা হয়তো অ্যাটাকের চেয়েও খারাপ।

কারণ অ্যাটাক হয় কিছুক্ষণের জন্য। কিন্তু ভয় থাকে সবসময়।

এখন আমি জানি – আমার শরীরের ভেতর একটা বিপজ্জনক যন্ত্র আছে। যেকোনো সময় সেটা চালু হয়ে যেতে পারে। আর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই সেটার ওপর।

এই কথাটা ভাবতে ভাবতেই আবার সেই খসখস ভাব শুরু হয়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *