ব্লগ

বুমেরাং নিয়ম

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। রাস্তায় একটা বয়স্ক মানুষ পড়ে গিয়েছিলেন। আমি তাকে উঠতে সাহায্য করলাম। তিনি দোয়া করলেন। বললেন, “আল্লাহ্‌ তোমার মঙ্গল করুন।”

দুপুরে অফিস থেকে ফোন। গত সপ্তাহের ইন্টারভিউর রেজাল্ট। চাকরি হয়েছে।

কাকতালীয়? নাকি সেই বয়স্ক মানুষের দোয়ার ফল?

বাসায় ফিরে হ্যাপিকে বললাম, “মনে হচ্ছে ভালো কাজের ফল পেয়েছি।”

“কী রকম?”

“সকালে একজনকে সাহায্য করেছি। দুপুরে চাকরির খবর।”

হ্যাপি হেসে বলল, “তুমি আবার কর্মফলে বিশ্বাস করো?”

আমি ভাবলাম। করি কি? নাকি এগুলো শুধু কাকতালীয়?

আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি মনে করো ভালো কাজের ভালো ফল হয়?”

“হ্যাঁ। আমি ক্লাসে বন্ধুদের সাহায্য করি। তারাও আমাকে সাহায্য করে।”

“আর খারাপ কাজের?”

“খারাপ ফল। যে মারে, সেও মার খায়।”

আরাশের সহজ উত্তর শুনে আমি ভাবলাম—এটা কি সত্যিই এত সহজ?

আমি নিজের জীবনটা খতিয়ে দেখলাম। যখন আমি সৎ ছিলাম, ভালো কিছু হয়েছে। যখন অসৎ হয়েছি, সমস্যায় পড়েছি।

প্রথম চাকরিতে আমি একবার মিথ্যা বলেছিলাম। ছুটি নিয়ে বলেছিলাম অসুস্থ। আসলে বন্ধুর বিয়েতে গিয়েছিলাম। পরদিন বসকে সত্যি সত্যি অসুস্থ দেখাতে গিয়ে ঠাণ্ডা লেগে গেল। সত্যিই অসুস্থ হয়ে পড়লাম।

আরেকবার একটা প্রোজেক্টে অন্যের কৃতিত্ব নিজের নামে দিয়েছিলাম। পরে ধরা পড়ে গেল। চাকরি প্রায় চলে যাওয়ার অবস্থা।

আবার যখন সৎ ছিলাম, ভালো হয়েছে। হ্যাপিকে প্রথম দিনেই বলেছিলাম আমার আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। সে বলেছিল, “টাকা-পয়সা নয়, মানুষটা ভালো হলেই হয়।”

দরিদ্র প্রতিবেশীকে যখন সাহায্য করেছি, পরে কঠিন সময়ে তারাই এগিয়ে এসেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ফেরত আসাটা কীভাবে কাজ করে?

আমি জামিউরকে জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল, “এটা বিজ্ঞান ভাই। তুমি যা দাও, তাই ফেরত পাও।”

“কীভাবে?”

“ধর তুমি কারো সাথে ভালো ব্যবহার করলে। সে খুশি হলো। সে অন্য কারো সাথে ভালো ব্যবহার করবে। এভাবে একটা চেইন তৈরি হয়। কোনো না কোনোভাবে তোমার কাছে ফিরে আসে।”

আমি বুঝলাম। এটা একটা নেটওয়ার্কের মতো। আমি ভালো কিছু পাঠালে ভালো ফিরে আসে। খারাপ পাঠালে খারাপ।

কিন্তু সময়টা কত লাগে? কেউ কেউ সারাজীবন খারাপ কাজ করে ভালো থাকে। আবার কেউ ভালো কাজ করেও কষ্ট পায়।

হ্যাপিকে বললাম, “কর্মফল যদি সত্যি হয়, তাহলে কেন দুর্নীতিবাজরা সুখে থাকে?”

হ্যাপি বলল, “হয়তো তাদের ফল এখনো আসেনি। অথবা আসছে কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি না।”

আমি ভাবলাম। হয়তো কর্মফল শুধু বাহ্যিক নয়। অভ্যন্তরীণও।

দুর্নীতিবাজ হয়তো টাকা পায়। কিন্তু মানসিক শান্তি পায় না। সবসময় ভয়ে থাকে। কখন ধরা পড়ব। কখন সব শেষ হয়ে যাবে।

ভালো মানুষ হয়তো কম টাকা পায়। কিন্তু নিশ্চিন্তে ঘুমায়। মাথা উঁচু করে চলে।

তাহলে কর্মফল দুরকম। বাইরের আর ভেতরের।

আমি আরো ভাবলাম। হয়তো কর্মফল তৎক্ষণাৎ হয় না। হয় ধীরে ধীরে। একটা বিল্ডআপ।

আমি যদি প্রতিদিন ছোট ছোট ভালো কাজ করি, তাহলে একটা পজিটিভ এনার্জি তৈরি হয়। মানুষ আমাকে পছন্দ করে। বিশ্বাস করে। সুযোগ দেয়।

আর যদি প্রতিদিন ছোট ছোট খারাপ কাজ করি, তাহলে নেগেটিভ এনার্জি। মানুষ আমাকে এড়িয়ে চলে। সন্দেহ করে। সুযোগ দেয় না।

এভাবে কর্মফল আসে।

সাইফুলের সাথে এই নিয়ে কথা হলো। সে বলল, “এটা প্রোগ্রামিংয়ের মতো। তুমি যে কোড লিখবে, সেই আউটপুট পাবে।”

“কীভাবে?”

“তুমি ভালো কোড লিখলে প্রোগ্রাম ভালো চলবে। খারাপ কোড লিখলে ক্র্যাশ করবে। কর্মফলও তাই।”

আমি বুঝলাম। জীবনও একটা প্রোগ্রাম। আমার কর্ম হলো ইনপুট। ফলাফল হলো আউটপুট।

আমি যে ধরনের কর্ম করি, সেই ধরনের ফলাফল পাই।

পরদিন থেকে একটা এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলাম। প্রতিদিন সচেতনভাবে ভালো কাজ করার চেষ্টা করবো। দেখবো কী হয়।

প্রথম দিন বাসে একজন অন্ধকে সিট ছেড়ে দিলাম। সেদিন অফিসে একটা ভালো খবর পেলাম।

দ্বিতীয় দিন একটা হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগ মালিককে ফেরত দিলাম। সেদিন হ্যাপি আমার প্রিয় খাবার রান্না করেছিল।

তৃতীয় দিন একটা গরিব ছেলেকে বই কিনে দিলাম। সেদিন পুরনো এক বন্ধু ফোন করে সাহায্যের হাত বাড়াল।

এটা কি কাকতালীয়? নাকি সত্যিই কর্মফল?

আরাশ বলল, “বাবা, তুমি আজকাল অনেক ভালো মানুষ হয়েছো।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কীভাবে বুঝলে?”

“তোমার মুখে একটা আলাদা ভাব। যেন তুমি নিজের সাথে খুশি।”

এটাই হয়তো কর্মফলের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বাইরের ফলাফল হোক বা না হোক, ভেতরে একটা শান্তি আসে।

যখন আমি ভালো কাজ করি, নিজের সাথে গর্ববোধ করি। যখন খারাপ কাজ করি, অপরাধবোধে ভুগি।

এই অপরাধবোধ আর গর্ববোধই হয়তো তাৎক্ষণিক কর্মফল।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—আমি ভালো কাজ করব। ফলাফলের জন্য নয়। শুধু এই কারণে যে এটা সঠিক।

কারণ সবচেয়ে বড় কর্মফল হলো—নিজের সাথে শান্তিতে থাকতে পারা।

আর এই শান্তিই সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *