মাসের শেষে বসি হিসাব কষতে। একটা খাতায় লিখি সব খরচ। ঘরভাড়া, স্কুলের ফি, বাজারের টাকা, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের বিল।
হিসাব শেষে দেখি, আমার স্বপ্নের জন্য কোনো টাকা অবশিষ্ট নেই।
একটা সময় আমার স্বপ্ন ছিল একটা ভালো ক্যামেরা কেনার। ছবি তুলতে ভালো লাগত। ভাবতাম, একদিন ফটোগ্রাফি শিখব।
কিন্তু সেই ক্যামেরার টাকা দিয়ে আরাশের স্কুলের বই কিনতে হয়েছে।
আমার স্বপ্ন ছিল একটা ছোট বই লেখার। ভাবতাম, নিজের টাকায় ছাপিয়ে বিতরণ করব।
কিন্তু সেই বইয়ের টাকা দিয়ে হ্যাপির চিকিৎসা করাতে হয়েছে।
আমার স্বপ্ন ছিল একটা ছোট ভ্রমণের। একা একা কোথাও যাব। নিজেকে খুঁজে নেব।
কিন্তু সেই ভ্রমণের টাকা দিয়ে ঘরের ফ্যান মেরামত করতে হয়েছে।
পরিবার হওয়ার পর আমার স্বপ্নগুলো একটা একটা করে ছোট হয়েছে। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেছে।
আমি এখন স্বপ্ন দেখি না নিজের জন্য। স্বপ্ন দেখি আরাশের জন্য। হ্যাপির জন্য।
আমার সব আকাঙ্ক্ষা এখন তাদের কেন্দ্র করে।
কিন্তু মাঝে মাঝে রাতে শুয়ে ভাবি, আমার নিজের কী হলো? আমার ব্যক্তিগত স্বপ্নগুলো কী হয়েছে?
আমি একটা ভালো গিটার কিনতে চেয়েছিলাম। শিখতে চেয়েছিলাম গান।
কিন্তু সেই গিটারের টাকা দিয়ে আরাশের জন্য সাইকেল কিনেছি।
আমি আফসোস করি না। আরাশের সাইকেলে চড়া দেখে আমার খুশি হয়। কিন্তু আমার ভিতরের সেই গিটারবাদকটি নীরব হয়ে গেছে।
আমার স্বপ্ন ছিল একটা ছোট লাইব্রেরি তৈরি করার। বই কিনে কিনে সাজাব।
কিন্তু বইয়ের টাকা দিয়ে হ্যাপির শাড়ি কিনেছি।
আমি দুঃখিত নই। হ্যাপির শাড়ি পরা দেখে আমার ভালো লাগে। কিন্তু আমার ভিতরের পাঠকটি তৃষ্ণার্ত থেকে যায়।
পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি বুঝেছি, নিজের স্বপ্ন পূরণ করা একটা বিলাসিতা।
আমার প্রথম দায়িত্ব পরিবারের মানুষগুলোর প্রয়োজন মেটানো।
কিন্তু এই বুঝ আমার মনে একটা শূন্যতা তৈরি করেছে।
আমি আর স্বপ্ন দেখি না। কারণ স্বপ্ন দেখলে কষ্ট হয়। স্বপ্ন পূরণ করার সামর্থ্য নেই।
মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কি নিজের জীবন বাঁচছি? নাকি শুধু অন্যদের জীবনের জন্য বেঁচে আছি?
কিন্তু তারপরই মনে হয়, এটাই তো ভালোবাসা। নিজের স্বপ্ন উৎসর্গ করে অন্যদের স্বপ্ন পূরণ করা।
আমি আমার স্বপ্নের ক্যামেরা কিনতে পারিনি। কিন্তু আরাশের চোখে স্বপ্ন দেখি।
আমি আমার স্বপ্নের বই লিখতে পারিনি। কিন্তু আরাশের জীবনে সুন্দর অধ্যায় লেখার চেষ্টা করি।
আমি আমার স্বপ্নের ভ্রমণে যেতে পারিনি। কিন্তু হ্যাপির সাথে প্রতিদিন ভালোবাসার ভ্রমণে যাই।
হ্যাপি একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমার কোনো স্বপ্ন নেই?”
আমি বলেছিলাম, “তোমরাই তো আমার স্বপ্ন।”
কিন্তু সত্যি কথা হলো, আমার ব্যক্তিগত স্বপ্নগুলো চাপা পড়ে আছে হিসাবের খাতার নিচে।
কখনো কখনো সেই স্বপ্নগুলো নড়েচড়ে ওঠে। আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আমিও একটা স্বতন্ত্র মানুষ। শুধু স্বামী বা বাবা নই।
কিন্তু আমি সেই স্বপ্নগুলোকে আবার চাপা দিয়ে রাখি। কারণ আমি জানি, এই মুহূর্তে তাদের পূরণ করা সম্ভব নয়।
আমি অপেক্ষায় থাকি। কোনো একদিন যখন আর্থিক স্বচ্ছলতা আসবে, তখন হয়তো আমার স্বপ্নগুলোকে আবার জাগিয়ে তুলব।
কিন্তু আমি জানি না, ততদিনে সেই স্বপ্নগুলো বেঁচে থাকবে কিনা।
স্বপ্নেরও তো একটা সময় আছে। একটা বয়স আছে।
আমার ভয় হয়, আমার স্বপ্নগুলো হয়তো হিসাবের খাতার নিচে চাপা পড়ে মরে যাবে।
কিন্তু তবুও আমি আশা রাখি। কারণ যে মানুষ পরিবারের জন্য নিজের স্বপ্ন উৎসর্গ করতে পারে, তার স্বপ্ন দেখার অধিকার কখনো শেষ হয় না।
একটু ভাবনা রেখে যান