ছায়া
একটি কাল্পনিক গল্প
রাত সাড়ে এগারোটায় ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে জাকির সাহেব প্রথমবার নিজের ছায়াকে ভয় পেলেন।
ছায়াটা তাঁর নয়। হতে পারে না।
মাটিতে যা পড়ে আছে সেটা একজন মানুষের ছায়া নয়। সেটা একটা দানবের ছায়া। মাথা লম্বা, হাত বাঁকা, পিঠ কুঁজো। যেন কোনো আদিম প্রাণী মাটিতে হামাগুড়ি দিচ্ছে।
জাকির সাহেব নিজের দিকে তাকালেন।
সোজা পিঠ। স্বাভাবিক হাত। মাথায় চুল একটু পাতলা, কিন্তু আকৃতি স্বাভাবিক।
তাহলে এই বিকৃত ছায়া কার?
তিনি এক পা এগোলেন। ছায়াটাও এগোলো।
থামলেন। ছায়াটাও থামলো।
হাত তুললেন। ছায়াটাও তুললো।
কিন্তু ছায়ার হাতটা দেখতে লাগলো একটা থাবার মতো। নখ লম্বা, আঙুল বাঁকা।
জাকির সাহেবের বুক ধড়ফড় করতে লাগলো।
দিনের বেলা এই ছায়া কোথায় থাকে?
সকালে অফিসে যাওয়ার সময় রোদে হাঁটেন। পায়ের কাছে একটা ছোট্ট কালো দাগ থাকে। নিরীহ। অস্তিত্বহীন প্রায়।
দুপুরে ছায়া আরো ছোট হয়। প্রায় পায়ের নিচে লুকিয়ে যায়।
বিকেলে একটু লম্বা হয়। কিন্তু তখনো স্বাভাবিক দেখায়।
রাতে?
রাতে ছায়া জেগে ওঠে।
জাকির সাহেব হাঁটতে শুরু করলেন। দ্রুত পা ফেললেন।
ছায়াটা পেছনে লাগলো। কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে। যখন যে ল্যাম্পপোস্টের কাছে যাচ্ছেন, সেদিকে ঘুরে যাচ্ছে।
একবার সামনে পড়লো।
জাকির সাহেব নিজের ছায়ার উপর পা দিলেন। পা দিয়ে মাড়িয়ে দিতে চাইলেন।
কিন্তু ছায়া মাড়ানো যায় না। সে সবসময় এক পা এগিয়ে থাকে।
বাড়ি ফিরলেন।
স্ত্রী পারভিন ঘুমিয়ে গেছেন। ছেলে রিফাত নিজের ঘরে।
জাকির সাহেব বাথরুমে গেলেন। আলো জ্বালালেন।
আয়নায় নিজেকে দেখলেন।
স্বাভাবিক মুখ। ক্লান্ত চোখ। একটু দাড়ি গজিয়েছে।
কিন্তু আয়নার পেছনে দেয়ালে যে ছায়া পড়েছে, সেটা…
জাকির সাহেব ঘুরে তাকালেন।
কিছু নেই। শুধু দেয়াল।
আবার আয়নায় তাকালেন।
ছায়া স্বাভাবিক।
তিনি বুঝলেন না কী দেখেছিলেন। হয়তো কিছুই না।
সেই রাতে ঘুম এলো না।
শুয়ে শুয়ে ভাবলেন — ছায়া কী?
পদার্থবিজ্ঞান বলে, আলো যখন কোনো বস্তুতে বাধা পায়, তখন সেই বস্তুর পেছনে অন্ধকার থাকে। সেটাই ছায়া।
কিন্তু এই ব্যাখ্যা কেন যথেষ্ট মনে হচ্ছে না?
ছায়া কি শুধু আলোর অনুপস্থিতি? নাকি অন্য কিছু?
পরদিন অফিসে গেলেন।
সারাদিন কাজ করলেন। মিটিং করলেন। ফাইল দেখলেন।
কিন্তু মাথায় একটাই চিন্তা — সন্ধ্যা হলে কী হবে?
পাঁচটায় অফিস ছুটি। বাইরে এলেন। সূর্য হেলে পড়েছে।
তাঁর ছায়া লম্বা হয়ে মাটিতে পড়েছে।
দেখতে… স্বাভাবিক?
না, পুরোপুরি না।
মাথার অংশটা একটু বেশি বড়। হাতগুলো একটু বেশি লম্বা।
নাকি তাঁর মনের ভুল?
বাসায় ফিরে পারভিনকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কি রাতে অন্যরকম হয়ে যাই?”
পারভিন অবাক হলেন। “মানে?”
“মানে… দিনের চেয়ে আলাদা?”
পারভিন কিছুক্ষণ ভাবলেন।
“তুমি রাতে একটু চুপচাপ থাকো। দিনে যা বলো, রাতে বলো না।”
“আর কিছু?”
“মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি অনেক দূরে আছো। শরীর এখানে, মন অন্য কোথাও।”
জাকির সাহেব চুপ করে রইলেন।
সেই রাতে বারান্দায় গেলেন।
পূর্ণিমার চাঁদ। ঝকঝকে আলো।
বারান্দার মেঝেতে তাঁর ছায়া পড়েছে।
এবার স্পষ্ট দেখলেন।
ছায়ার মুখে একটা হাসি আছে। কিন্তু তিনি হাসছেন না।
জাকির সাহেব কাঁপতে লাগলেন।
এটা কী দেখছেন?
ছায়া তো নিজে নড়তে পারে না। ছায়া তো শুধু প্রতিবিম্ব।
তাহলে কেন ছায়া হাসছে?
তিনি মুখ শক্ত করলেন। ছায়াতেও মুখ শক্ত হলো।
হাসি গেল।
তিনি ভাবলেন — মনের ভুল। ক্লান্তি।
কিন্তু একটা সন্দেহ রয়ে গেল।
পরের কয়েকদিন জাকির সাহেব ছায়াকে পর্যবেক্ষণ করলেন।
দিনের বেলা সবকিছু স্বাভাবিক।
সন্ধ্যা হলে ছায়া বদলাতে শুরু করে।
রাত গভীর হলে ছায়া আরো বদলায়।
মধ্যরাতে ছায়া সবচেয়ে বিকৃত।
যেন রাত ছায়াকে শক্তি দেয়।
একদিন রাতে রিফাত জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, তুমি কি অসুস্থ?”
“কেন?”
“তোমাকে অন্যরকম লাগছে। যেন ভয় পাচ্ছো।”
জাকির সাহেব ছেলের দিকে তাকালেন।
রিফাতের পেছনে দেয়ালে তার ছায়া পড়েছে।
স্বাভাবিক ছায়া। একটা কিশোরের ছায়া।
কিন্তু জাকির সাহেবের ছায়া?
তিনি নিজের ছায়ার দিকে তাকালেন।
দেয়ালে একটা বিশাল আকৃতি। মাথা ছাদ পর্যন্ত উঠে গেছে।
“বাবা?”
জাকির সাহেব সামলে নিলেন। “কিছু না, বাবা। একটু ক্লান্ত।”
সেই রাতে স্বপ্ন দেখলেন।
তিনি একটা বিশাল মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন। চারদিকে আলো নেই। শুধু তাঁর পায়ের কাছে একটা স্পটলাইট।
তাঁর ছায়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। পুরো মাঠ জুড়ে।
ছায়াটা উঠে দাঁড়ালো।
হ্যাঁ, মাটি থেকে উঠে দাঁড়ালো।
জাকির সাহেবের সামনে এসে দাঁড়ালো।
একই উচ্চতা। একই আকার। কিন্তু সম্পূর্ণ কালো।
ছায়া বললো, “চিনতে পারছো?”
জাকির সাহেব বলতে পারলেন না।
“আমি তুমি। তোমার আসল রূপ।”
“আমি এরকম না।”
“দিনের বেলা না। রাতে হও।”
“মিথ্যা।”
ছায়া হাসলো। সেই হাসি জাকির সাহেব আগে দেখেছেন। বারান্দায়।
“তুমি যা লুকিয়ে রাখো, আমি তাই। তোমার রাগ, ঈর্ষা, হতাশা, ব্যর্থতা — সব আমার মধ্যে। দিনে তুমি মুখোশ পরো। রাতে মুখোশ খুলে যায়। থাকি শুধু আমি।”
জাকির সাহেব চিৎকার করতে চাইলেন। পারলেন না।
ছায়া এগিয়ে এলো। তাঁকে জড়িয়ে ধরলো।
ঘুম ভাঙলো।
সকালে আয়নায় দাঁড়ালেন।
নিজেকে দেখলেন।
মুখে কি একটু কালো দাগ? নাকি ছায়ার ছাপ?
তিনি মুখ ধুলেন। দাগ গেল।
কিন্তু মনের দাগ গেল না।
সেদিন অফিসে বসে ভাবলেন — ছায়া কি সত্যিই আমাদের আসল রূপ?
আমরা যা দেখাই, সেটা কি শুধু আলোতে তৈরি মুখোশ?
আমাদের ভেতরের অন্ধকার কি রাতের ছায়ায় বেরিয়ে আসে?
তিনি ভাবলেন তাঁর নিজের কথা।
অফিসে তিনি ভদ্র মানুষ। হাসিমুখে কথা বলেন।
কিন্তু ভেতরে? ভেতরে কি একজন ক্লান্ত, হতাশ, রাগী মানুষ নেই?
বসের উপর রাগ। সহকর্মীদের উপর ঈর্ষা। নিজের উপর হতাশা।
এগুলো কোথায় যায়?
হয়তো ছায়ায়।
সেই রাতে আবার রাস্তায় হাঁটলেন।
ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ালেন।
ছায়ার দিকে তাকালেন।
এবার ভয় পেলেন না।
বললেন, “তুমি আমি। আমি জানি।”
ছায়া নড়লো। বাতাসে নড়লো হয়তো। কিন্তু মনে হলো সাড়া দিলো।
“তোমাকে অস্বীকার করব না। তুমি আমার অংশ।”
বাড়ি ফিরলেন।
পারভিন জেগে ছিলেন।
“কোথায় গিয়েছিলে?”
“হাঁটতে।”
“এত রাতে?”
জাকির সাহেব বসলেন পারভিনের পাশে।
“তোমাকে একটা কথা বলি?”
“বলো।”
“আমি সবসময় যা দেখাই, তা না। ভেতরে অনেক অন্ধকার আছে।”
পারভিন চুপ করে রইলেন।
“তুমি কি আমাকে নিয়ে ভয় পাও?”
পারভিন মাথা নাড়লেন। “না।”
“কেন?”
“কারণ সবার ভেতরে অন্ধকার আছে। তুমি আলাদা না।”
জাকির সাহেব জানালার দিকে তাকালেন।
বাইরে চাঁদের আলো। তাঁর ছায়া মেঝেতে পড়ে আছে।
এখনো বিকৃত। এখনো বড়।
কিন্তু এখন আর ভয় লাগছে না।
কারণ তিনি জানেন এটা তাঁরই অংশ।
ছায়াকে অস্বীকার করলে নিজেকে অস্বীকার করা হয়।
পরদিন সকালে রোদে বেরোলেন।
ছায়া ছোট হয়ে পায়ের কাছে লুকিয়ে আছে।
দিনের আলোতে সে বিনয়ী।
রাতে সে বড় হবে।
দুটোই সত্য।
দুটোই জাকির সাহেব।
[এই গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]
একটু ভাবনা রেখে যান