রোদে হাঁটছি। পাশে আমার ছায়া। সে আমার সাথে সাথে চলে, কিন্তু কখনো আমার সমান হয় না। কখনো বড়, কখনো ছোট। কখনো সামনে, কখনো পেছনে।
হঠাৎ মনে হয় – এই ছায়াটা কি আমি? নাকি আমি হচ্ছি ছায়া?
রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজের ছায়ার দিকে তাকাই। সে একেবারে আমার মতো দেখতে। কিন্তু সে কালো। সম্পূর্ণ কালো। তার কোনো রং নেই, কোনো বিস্তার নেই।
আমি হাত তুলি। সেও হাত তোলে। আমি মাথা নাড়াই। সেও মাথা নাড়ায়। আমি যা করি, সেও তাই করে। কিন্তু সে কি আমার অনুকরণ করছে? নাকি আমি তার?
হাঁটতে হাঁটতে ভাবি – এই ছায়া আমার চেয়ে বেশি সৎ। সে যা, তাই দেখায়। কোনো ভান নেই, কোনো মুখোশ নেই। সে শুধু একটা shape। আমার shape।
কিন্তু আমি? আমার একটা মুখ আছে যেটা হাসে, কিন্তু ভেতরে কান্না। একটা গলা আছে যেটা বলে “ভালো আছি”, কিন্তু আসলে ভালো নেই।
ছায়া এসব পারে না। সে শুধু অনুসরণ করে।
হয়তো আমার ছায়াই আমার আসল রূপ। সব জটিলতা বাদ দিয়ে। শুধু একটা outline।
বাঁক নিলাম। ছায়া দিক বদলাল। কিন্তু সে আমাকে ছাড়ল না। সে কখনো আমাকে ছাড়ে না।
এই ছায়া কি আমার আত্মা? নাকি আমার অস্তিত্বের প্রমাণ?
যখন আমি নেই, ছায়াও নেই। যখন আমি আছি, ছায়াও আছে। আমরা একসাথে। কিন্তু আমরা এক নই।
দুপুরে রোদ মাথার ওপর। ছায়া ছোট হয়ে গেছে। আমার পায়ের নিচে। যেন সে লুকিয়ে আছে।
বিকেলে রোদ সামনে। ছায়া বড় হয়ে গেছে। আমার পেছনে। যেন সে দূরে সরে যাচ্ছে।
সন্ধ্যায় ছায়া দীর্ঘ হয়ে গেছে। অনেক দীর্ঘ। যেন সে আমার চেয়ে বেশি জায়গা নিয়ে নিয়েছে।
রাতে ছায়া অদৃশ্য। কিন্তু আমি জানি সে আছে। অন্ধকারে আরো অন্ধকার হয়ে।
আমি কি আমার ছায়ার মতো? দিনের বেলা দেখা যায়, রাতে অদৃশ্য?
নাকি উল্টো? আমি দিনের বেলা অদৃশ্য, রাতে দেখা যায়?
একটা বেঞ্চে বসি। ছায়াও বসে। আমি উঠি। সেও ওঠে। আমি যেদিকে যাই, সে সেদিকে যায়।
কিন্তু সে কি চায় যেতে? নাকি আমার সাথে যেতে বাধ্য?
হয়তো সে একটা prisoner। আমার prisoner। আমি যেখানে যাই, তাকেও যেতে হয়।
অথবা আমি তার prisoner। সে যেখানে যায়, আমাকেও যেতে হয়।
কিন্তু আমরা তো একসাথেই যাই। তাহলে কে কার prisoner?
মাঝে মাঝে ভাবি – আমি যদি ছায়া ছাড়া থাকতে পারতাম। কেমন লাগত?
হয়তো মনে হতো আমি অসম্পূর্ণ। একটা অংশ হারিয়েছি।
অথবা মনে হতো আমি মুক্ত। কেউ আমাকে ফলো করছে না।
কিন্তু ছায়া তো আমার শত্রু নয়। সে আমার সাথী। একমাত্র সাথী যে কখনো আমাকে ছেড়ে যায় না।
অন্য সবাই চলে যায়। কিন্তু ছায়া থাকে।
আমি তার নাম রাখি “সাথী”। যদিও সে কথা বলে না।
“সাথী, তুমি কি ক্লান্ত? তুমি কি বিরক্ত আমার সাথে সবসময় থেকে?”
সাথী কোনো উত্তর দেয় না। শুধু আমার movements copy করে।
“সাথী, তুমি কি জানো আমি কে?”
এবারও কোনো উত্তর নেই।
হয়তো সে জানে। হয়তো সে আমার চেয়ে ভালো জানে আমি কে।
কারণ সে আমাকে দেখে বাইরে থেকে। আর আমি দেখি ভেতর থেকে।
বাড়ি ফেরার সময় লাইটপোস্টের নিচে দিয়ে যাই। ছায়া আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মনে হয় – এই লাইটটাই আমার জীবন। আর আমি ও আমার ছায়া দুজনেই এই আলোর game।
আলো থাকলে ছায়া থাকে। আলো না থাকলে ছায়া থাকে না।
তাহলে আমার অস্তিত্ব কি এই আলোর ওপর নির্ভর করে?
আলো নিভে গেলে আমিও কি নিভে যাব?
এই প্রশ্নের উত্তর সাথী জানে। কিন্তু সে বলবে না।
সে শুধু আমার সাথে হাঁটবে। সারাজীবন।
আর আমি হাঁটব তার সাথে। এই প্রশ্ন নিয়ে।
একটু ভাবনা রেখে যান