ব্লগ

নীরব চেতনার জগৎ

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

মামাতো ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় কোমায়। তিন মাস হলো। চোখ বন্ধ। শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে যন্ত্রের সাহায্যে। কিন্তু তিনি কোথায়?

হাসপাতালে দাঁড়িয়ে ভাবি—তার ভিতরে কী চলছে?

ডাক্তার বলেছেন, “ব্রেইন অ্যাক্টিভিটি আছে।” মানে চেতনা জীবিত। কিন্তু কোন জগতে বিচরণ করছে সেই চেতনা?

কোমার রোগীরা কি স্বপ্ন দেখে?

তার হাত ধরে বসি। কখনো কখনো আঙুল নড়ে। কপাল কুঁচকে যায়। যেন কিছু অনুভব করছে। কিন্তু প্রকাশ করতে পারে না।

ভিতরে একটা সম্পূর্ণ জীবন চলছে হয়তো।

পড়েছি কিছু কোমার রোগী জেগে উঠে বলে—”আমি সব শুনতে পেতাম। কিন্তু উত্তর দিতে পারতাম না।” তাহলে তারা আমাদের কথোপকথন শোনে?

আমরা যা ভাবি “অচেতন” সে কি পুরোপুরি চেতন?

মামাতো ভাইয়ের কানের কাছে বলি, “তুমি কি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছো?” কোনো সাড়া নেই। কিন্তু হৃদস্পন্দনের মনিটর একটু বেড়ে যায়।

নীরবতার আড়ালে কি আর্তনাদ লুকিয়ে?

কোমার রোগীদের নিয়ে গবেষণা পড়ি। কেউ কেউ জেগে উঠে বর্ণনা করে অবিশ্বাস্য স্বপ্নের জগৎ। সেখানে তারা সুস্থ। হাঁটাচলা করে। স্বাভাবিক জীবন।

কোমা কি বিকল্প বাস্তবতার দরজা?

তার স্ত্রী প্রতিদিন আসে। পুরনো গান বাজায়। তাদের বিয়ের ছবি দেখায়। কখনো কখনো তার চোখে পানি দেখি।

স্মৃতি কি কোমার গভীরেও পৌঁছায়?

একদিন নার্স বলল, “যখন তার প্রিয় গান বাজায়, তখন ব্রেইন অ্যাক্টিভিটি বাড়ে।” তাহলে শুধু শরীর নিথর। মন সক্রিয়।

আমরা কি ভুল করে তাদের মৃত ভাবি?

কোমার রোগীরা কি আমাদের চেয়ে বেশি স্বপ্ন দেখে? তাদের REM স্ট্যাজ কী রকম? স্বপ্ন কি তাদের একমাত্র বাস্তবতা?

হয়তো তারা এমন জগতে বাস করে যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।

মনে পড়ে ছোটবেলার গল্প। রাজকুমারী শুয়ে আছে। একশো বছরের ঘুম। কিন্তু তার স্বপ্নে কী ছিল?

কোমা কি রূপকথার ঘুমের মতো?

কখনো ভাবি—যদি আমি কোমায় পড়ি, আমার স্বপ্নের জগৎ কেমন হবে? অফিসের চাপ থাকবে? পারিবারিক দায়বদ্ধতা থাকবে? নাকি সব বাধা থেকে মুক্ত এক জীবন?

কোমা কি চূড়ান্ত পলায়ন?

মামাতো ভাইয়ের মুখ দেখি। শান্ত। কোনো চিন্তার ভাঁজ নেই। যেন পরম শান্তিতে আছে।

হয়তো তার জগতে আমাদের চেয়ে কম যন্ত্রণা।

ডাক্তাররা বলে, “আশা ছাড়বেন না। মস্তিষ্ক রহস্যময়।” কিন্তু আশা কীসের? জেগে ওঠার? নাকি শান্তিতে থাকার?

কোন অবস্থা বেশি কাম্য?

কোমার রোগীদের কাছে সময়ের বোধ থাকে কি? তিন মাস তার কাছে তিন দিন নাকি তিন বছর?

চেতনার গভীরে সময় কি থাকে?

জেগে ওঠা রোগীরা বলে, “মনে হচ্ছিল কাল থেকে শুয়ে আছি।” আবার কেউ বলে, “অনন্তকাল কেটে গেছে।”

কোমায় সময়ের কোনো মাপজোক নেই।

হয়তো কোমা আমাদের চেতনার সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ। বাহ্যিক বিঘ্ন ছাড়া। শুধু মন আর স্বপ্ন।

নীরব চেতনার জগৎ হয়তো সবচেয়ে জীবন্ত।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *