বিকেলের রোদে আরাশ দৌড়াচ্ছে। নিজের ছায়ার সাথে।
লাফ দিচ্ছে। ছায়ার মাথায় পা দিতে চাইছে। কিন্তু ছায়া সরে যাচ্ছে।
আরাশ হাসছে। আবার চেষ্টা করছে।
আমি বারান্দায় বসে দেখছি।
আমিও খেলতাম এই খেলা। সাত বছর বয়সে। বাড়ির উঠানে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
দৌড়েছি। থেমেছি। হঠাৎ ঘুরেছি। ভেবেছিলাম চমকে দিলে হয়তো ছায়া পিছনে পড়ে থাকবে।
কিন্তু ছায়া? সে আমার সাথেই থাকে।
বাবা দেখেছিলেন একদিন। বলেছিলেন, “ছায়া ধরা যায় না।”
আমি বলেছিলাম, “পারব।”
বাবা হেসেছিলেন। কেন হেসেছিলেন? জানি না।
আরাশ এসে বসল পাশে। হাঁপাচ্ছে। ঘাম মুছছে।
“বাবা, ছায়া কেন আমার সাথে লেগে থাকে?”
“কারণ ছায়া তোমারই অংশ। আলো যখন তোমার গায়ে পড়ে, তোমার শরীর আলোকে আটকায়। যেখানে আলো পৌঁছায় না, সেখানেই ছায়া।”
আরাশ ভাবল। তারপর বলল, “তাহলে ছায়া মানে অন্ধকার?”
“না। ছায়া মানে… জানি না। তোমার উপস্থিতি হয়তো।”
“রাতে তো ছায়া থাকে না। তাহলে কি রাতে আমি নেই?”
থামলাম। ভালো প্রশ্ন।
“রাতে তুমি আছ। কিন্তু ছায়া নেই।”
“তাহলে ছায়া ছাড়াও থাকা যায়?”
“হ্যাঁ।”
আরাশ উঠে গেল। আবার দৌড়াতে শুরু করল।
হ্যাপি বারান্দায় এল। চা দিল।
“কী দেখছ?”
“আরাশকে। ছায়ার সাথে খেলছে।”
হ্যাপি তাকাল। হাসল।
“তুমিও খেলতে না?”
“হ্যাঁ। ছোটবেলায়।”
“কী ভাবছ?”
কী ভাবছি? জানি না।
“ভাবছি আমিও এভাবে দৌড়াতাম। কিন্তু কখনো ধরতে পারিনি।”
“ধরা যায়?”
“না।”
হ্যাপি চা খেল। তারপর বলল, “মনে আছে মা একটা গল্প বলতেন?”
“কোন গল্প?”
“এক রাজা নাকি নিজের ছায়াকে ভয় পেত। মনে করত ছায়া তার সব গোপন কথা জানে। তাই সারাদিন অন্ধকার ঘরে থাকত।”
“তারপর?”
“তারপর একদিন দেখল সে নিজেই ছায়া হয়ে গেছে।”
অদ্ভুত গল্প।
আরাশ আবার এল। “আব্বু, আমি কি কখনো ধরতে পারব?”
“না।”
“তাহলে আমি কেন চেষ্টা করছি?”
ভালো প্রশ্ন। কেন?
“তুমি বলো। কেন চেষ্টা করছ?”
আরাশ ভাবল। তারপর হাসল। “কারণ দৌড়ানোটা মজার।”
দৌড়ানোটা মজার।
হ্যাপি আমার দিকে তাকাল। হাসল।
রাতে খাবার খেতে বসলাম। আরাশ বলল, “আব্বু, ছায়ার কি বন্ধু আছে?”
“মানে?”
“মানে আমার ছায়া তোমার ছায়ার সাথে খেলে?”
হাসলাম। “জানি না। হয়তো।”
“আমি মনে করি খেলে। আমরা যখন একসাথে থাকি, ওরাও একসাথে থাকে।”
হ্যাপি বলল, “ভালো কথা। তাহলে ছায়ারাও পরিবার।”
আরাশ খুশি হলো। “হ্যাঁ! ছায়া পরিবার!”
খাওয়ার পর ছাদে উঠলাম। রাত। ছায়া নেই।
আরাশ সাথে এল। “আব্বু, এখন আমার ছায়া কোথায়?”
“কোথাও নেই। রাতে ছায়া থাকে না।”
“কেন?”
“কারণ আলো নেই।”
আরাশ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, “তাহলে রাতে আমি আরো বেশি আমি?”
কী বলছে?
“মানে?”
“মানে দিনে তো ছায়া থাকে। সে আমার সাথে থাকে। কিন্তু রাতে শুধু আমি। ছায়া ছাড়া। তাহলে রাতে আমি আরো বেশি আমি।”
থামলাম। এগারো বছরের বাচ্চা এই কথা বলছে।
“তুমি ঠিক বলছ হয়তো।”
আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম। আকাশে তারা।
হ্যাপি ডাকল নিচে থেকে। “আরাশ, ঘুমানোর সময়।”
আরাশ চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
মনে পড়ল একটা কথা। কে বলেছিল? বাবু? সাইফুল?
“আমরা যা খুঁজি, সেটা আমাদের সাথেই আছে।”
ছায়ার মতো। আমার সাথে লেগে আছে। কিন্তু ধরতে পারি না।
সুখ? সফলতা? পরিচয়? সব ছায়ার মতো?
জানি না।
পরদিন সকালে আরাশ আবার খেলছে। ছায়ার সাথে।
দৌড়াচ্ছে। হাসছে। ধরতে পারছে না। কিন্তু থামছে না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি জানো তুমি ধরতে পারবে না। তাহলে কেন খেলছ?”
“কারণ মজা লাগে আব্বু।”
মজা লাগে।
হয়তো এটাই উত্তর। খেলা। দৌড়ানো। চেষ্টা করা।
ধরা না যাক। কিন্তু দৌড়ানোটা তো আছে।
হ্যাপি বলল, “তুমি কী ভাবছ?”
“ভাবছি আরাশ ঠিক বলে।”
“কী বলে?”
“বলে দৌড়ানোটা মজার।”
হ্যাপি হাসল। “তুমিও দৌড়াবে?”
দৌড়াব? আমি?
“জানি না।”
সূর্য উঠছে। ছায়া লম্বা হচ্ছে।
বিকেলে আবার ছোট হবে। সন্ধ্যায় আবার লম্বা।
রাতে মিলিয়ে যাবে। সকালে আবার ফিরবে।
এভাবেই চলে। প্রতিদিন।
আরাশ দৌড়াচ্ছে। ছায়া দৌড়াচ্ছে।
হ্যাপি হাসছে। তার ছায়া পড়েছে মাটিতে।
আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমার ছায়া লম্বা হয়ে গেছে।
আমরা তিনজন। ছায়া তিনটা।
কোনটা বেশি সত্যি? জানি না।
হয়তো দুটোই সত্যি। হয়তো দুটোই মিথ্যা।
জানি না।
আরাশ এল। “আব্বু, চল আমার সাথে দৌড়াও।”
“আমি?”
“হ্যাঁ। তুমি তোমার ছায়া ধরো। আমি আমার ছায়া ধরি। দেখি কে আগে পারে।”
হাসলাম। “কেউ পারবে না।”
“জানি। কিন্তু চেষ্টা তো করতে পারি।”
হ্যাপি বলল, “যাও। দৌড়াও।”
উঠে দাঁড়ালাম। আরাশের হাত ধরলাম।
“ঠিক আছে। চল।”
আমরা দৌড়ালাম। ছায়া দৌড়াল সাথে সাথে।
আরাশ হাসছে। আমিও হাসছি।
ধরতে পারছি না। কিন্তু দৌড়াচ্ছি।
হয়তো এটাই যথেষ্ট। হয়তো না।
জানি না।
কিন্তু এখন দৌড়াচ্ছি। এটুকু জানি।
এটুকুই হয়তো যথেষ্ট।
হয়তো না।
জানি না।
একটু ভাবনা রেখে যান