চায়ের কাপে চিনির বদলে লবণ। এক চামচ মুখে দিয়েই বুঝলাম কী ভয়ানক ভুল করেছি। মুখের ভিতর যেন সমুদ্রের নোনতা জল ঢুকে গেছে। কিন্তু এই ভুলটা এখনই হল না। এর পেছনে আছে আমার মনের একটা অবস্থা, যেটা বোঝানো কঠিন।
আজ সকাল থেকেই মাথার ভিতর একটা ঘূর্ণিঝড় চলছে। অফিসের নতুন একটা প্রজেক্ট নিয়ে চিন্তা। আরাশের পরীক্ষার চাপ। হ্যাপির সাথে গতকাল একটা ছোট্ট মনোমালিন্য। এসব কিছুর মধ্যে চা বানানোর সময় মনটা ছিল হাজার মাইল দূরে।
হ্যাপি এসে জিজ্ঞেস করল, “কী হল? মুখ দেখে মনে হচ্ছে বিষ খেয়েছ।” আমি বলতে পারলাম না যে বিষ নয়, লবণ। এই সাধারণ ভুলটা করার জন্য কেমন যেন লজ্জা লাগছিল।
মনে পড়ে গেল ছোটবেলার কথা। মা রান্নাঘরে কাজ করার সময় বারবার বলতেন, “মন দিয়ে কাজ কর। নাহলে এমনি ভুল হয়ে যাবে।” তখন বুঝতাম না কথাটার মানে। আজ বুঝছি।
কিন্তু এই যে মন দেওয়া, এটা এত কঠিন কেন? সারাদিন মাথায় এত চিন্তা যে একটুও জায়গা বাকি থাকে না সাধারণ কাজের জন্য। চিনি-লবণ চেনার মতো সহজ বিষয়ের জন্যও।
আরাশ স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখল আমি নতুন করে চা বানাচ্ছি। জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, আগের চায়ে কী হয়েছিল?” আমি বললাম, “ভুল করে লবণ দিয়ে দিয়েছিলাম।” সে হেসে বলল, “এটা আমি কোনদিন করিনি।”
এগারো বছরের একটা ছেলে যেটা কোনদিন করেনি, সেটা আমি ঊনচল্লিশ বছর বয়সে করলাম। এটা নিয়ে আমার কি লজ্জিত হওয়া উচিত? নাকি এটাও জীবনের স্বাভাবিক অংশ?
দুপুরে অফিসে বসে ভাবছিলাম এই ভুলের কথা। সহকর্মী জামিউর বলল, “তুমি কী নিয়ে এত চিন্তা করছ?” আমি বললাম চা বানানোর সময় লবণ-চিনির ভুলের কথা। সে বলল, “এমন তো হয়েই থাকে। আমি তো একবার রান্নার সময় চিনির বদলে লবণ দিয়ে দিয়েছিলাম।”
তার এই কথায় একটু স্বস্তি পেলাম। মানে আমি একা নই যে এমন ভুল করি। কিন্তু তবুও প্রশ্ন থেকে যায় – আমাদের মন এত বিক্ষিপ্ত কেন যে সরল কাজেও ভুল হয়?
সন্ধ্যায় আবার চা বানাতে গিয়ে অন্তত দশবার চেক করলাম কোনটা চিনি, কোনটা লবণ। এই অতিরিক্ত সতর্কতাও কি একধরনের অসুস্থতা? নাকি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া?
হ্যাপি দেখল আমার এই অবস্থা। বলল, “তুমি এত সিরিয়াস হয়ে গেলে কেন? এমন ছোট একটা ভুলের জন্য।” আমি বুঝাতে পারলাম না যে এটা শুধু ছোট ভুল নয়। এটা আমার মানসিক অবস্থার প্রতিফলন।
রাতে শুয়ে ভাবলাম, জীবনে আরো কত ছোট ছোট ভুল করেছি যেগুলো মনে নেই। আর কত বড় ভুল হয়তো করে ফেলেছি মনের অনুপস্থিতিতে।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “এই যে আমার মনের অবস্থা, এর কি কোনো সমাধান আছে? নাকি এটাই আমার নিয়তি যে সব সময় চিন্তায় থাকব আর ছোট ছোট ভুল করব?”
হয়তো সমাধান আছে মনোযোগের মধ্যে। হয়তো প্রতিটি কাজ, যত ছোটই হোক, সেটা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে করতে হয়। চা বানানোও একটা ইবাদত হতে পারে যদি পূর্ণ সচেতনতার সাথে করা যায়।
আগামীকাল আবার চা বানাব। আবার সেই একই সম্ভাবনা যে ভুল হতে পারে। কিন্তু এবার চেষ্টা করব পুরো মনোযোগ দিয়ে। হয়তো এভাবেই শিখতে হয় জীবনযাপন করতে।
একটু ভাবনা রেখে যান