প্রিয় করিম ভাই,
আপনার ফোন আর রিসিভ করি না। জানি, আমার কারণে আপনার সমস্যা হচ্ছে। আপনিও তো অন্যের কাছে ধার করে আমাকে দিয়েছিলেন।
কিন্তু এই চিঠিটা লিখছি। হয়তো পড়বেন না। তবুও লিখছি।
২০২১ সালে যখন আপনার কাছে ৫০,০০০ টাকা চেয়েছিলাম, বলেছিলাম “দুই মাসে ফেরত দেব।” আপনি দিয়েছিলেন চোখ বুজে।
তিন বছর হয়ে গেল।
দুই মাস কেন, দুই বছরেও দিতে পারিনি। কেন পারিনি? গল্পটা লম্বা।
প্রথমে ভেবেছিলাম, পরের মাসের বেতন দিয়ে দেব। কিন্তু সেই মাসে আব্বার অসুখ। আরো ১০,০০০ খরচ।
তারপর ভেবেছিলাম, বোনাস পেলে দেব। বোনাস পেলাম ২০,০০০। দেব বলে নিয়ে গেলাম ব্যাংকে। কিন্তু পথে ফোন। আম্মার হার্ট অ্যাটাক। হাসপাতাল।
আপনার টাকা আবার পিছিয়ে গেল।
এভাবে একটার পর একটা। যেন আমার জীবনে ঝড়। একটা শেষ হতে না হতেই আরেকটা।
আপনি প্রথমে ভদ্র ছিলেন। “সমস্যা নেই। যখন পারবেন।”
তারপর মাঝে মাঝে কল। “কেমন আছেন? টাকার কী অবস্থা?”
তারপর প্রেশার। “ভাই, আমারও সমস্যা।”
তারপর রাগ। “এভাবে চলবে না।”
শেষে আর কল নেন না।
জানেন করিম ভাই, ঋণ মানে শুধু টাকা নয়। ঋণ মানে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া। ঋণ মানে নিজেকে অপরাধী মনে করা।
রাতে ঘুমাতে যাই। আপনার কথা মনে পড়ে। কত বিশ্বাস করে টাকা দিয়েছিলেন। আর আমি?
সকালে উঠি। আবার সেই চিন্তা। কীভাবে টাকা দেব?
আমার তালিকা দেখুন:
যাদের কাছে ঋণী:
- করিম ভাই: ৫০,০০০
- অফিসের সহকর্মী জামাল: ২০,০০০
- ক্রেডিট কার্ড: ৩০,০০০
- ব্যাংক লোন: ৮০,০০০
- দোকানদার: ৫,০০০
মোট: ১,৮৫,০০০ টাকা
মাসিক বেতন: ২৫,০০০
দেখুন অঙ্ক। আট মাসের বেতন সমান ঋণ। খাবো না? পরিবার চালাবো না?
কিন্তু হাল ছাড়িনি।
যা করেছি:
সন্ধ্যায় টিউশনি শুরু। মাসে ৮,০০০ আয়।
ফ্রিল্যান্সিং শিখেছি। কনটেন্ট রাইটিং। মাসে ৫,০০০।
বাড়ির অতিরিক্ত জিনিস বিক্রি। ১৫,০০০ পেয়েছি।
খরচ কমিয়েছি। রিকশার বদলে বাস। রেস্টুরেন্টের বদলে ঘরের খাবার।
ধীরে ধীরে টাকা জমা করছি।
এ পর্যন্ত ফেরত দিয়েছি:
- জামাল: ২০,০০০ (পুরো)
- ক্রেডিট কার্ড: ১৫,০০০
- দোকানদার: ৫,০০০ (পুরো)
বাকি আছে: ১,৪৫,০০০
আপনার টাকা এখনো বাকি। কিন্তু আশা ছাড়িনি।
জানেন কী শিখেছি এই তিন বছরে?
শিখেছি, ঋণ মানে শেষ নয়। শিক্ষা। শিখেছি, অর্থ ব্যবস্থাপনা। শিখেছি, কোথায় খরচ কাটতে হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, শিখেছি কাজ করতে। আগে শুধু চাকরি। এখন চার রকম আয়।
মানুষ বলে, “ঋণ করেছো কেন?”
বলি, “প্রয়োজন ছিল।”
“এত ঋণ কীভাবে?”
“একটার পর একটা।”
“এখন কী করবে?”
“ফেরত দেব। একটার পর একটা।”
করিম ভাই, আমি হার মানিনি। প্রতি মাসে ১০,০০০ করে সেভ করতে পারছি। আরো দেড় বছর লাগবে সব শেষ করতে।
আপনার টাকা দেব। অবশ্যই দেব। শুধু আরেকটু সময় চাই।
কিন্তু জানেন, আমি আর আগের মানুষ নই। ঋণ আমাকে শিখিয়েছে দায়িত্বশীল হতে। শিখিয়েছে কঠোর পরিশ্রম করতে।
এখন প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা কাজ করি। কিন্তু কষ্ট লাগে না। কারণ জানি, এই কাজের ফল একদিন পাব।
যেদিন আপনাকে ৫০,০০০ টাকা ফেরত দেব, সেদিন মনে হবে জিতেছি।
ঋণ থেকে মুক্তি মানে শুধু টাকা শোধ নয়। মানে নিজের কাছে নিজের মর্যাদা ফিরে পাওয়া।
আর সেই দিনটার জন্য অপেক্ষা করছি।
ধন্যবাদ,
যে এখনো লড়ছে
পুনশ্চ: আগামী মাসে ১০,০০০ টাকা দিতে পারব। শুরু হোক ফেরত দেওয়া।
একটু ভাবনা রেখে যান