আজ সকালে চা খেতে খেতে হ্যাপি বলল, “দেখ, পাখিটা কী সুন্দর গান গাইছে।” আমি কান পাতলাম। সত্যিই একটা দোয়েল পাখি আমাদের জানালার বাইরে গাইছে। কিন্তু আমি এতক্ষণ শুনিনি। আমি ব্যস্ত ছিলাম ফোনে অফিসের ইমেইল চেক করতে। এই যে পাখির গান, প্রতিদিন সকালে যেটা বাজে, আমি কখন থেকে শুনা বন্ধ করে দিয়েছি?
জীবনের ছোট আনন্দগুলো কি আমার অলক্ষ্যে হারিয়ে যাচ্ছে?
গতকাল বাসে উঠতে গিয়ে দেখি একটা বৃদ্ধ মানুষ একটা বাচ্চাকে জানালার ধারে বসিয়ে দিচ্ছেন। বাচ্চাটা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে হাততালি দিচ্ছে। তার খুশিতে সেই বৃদ্ধের মুখেও হাসি। এই দৃশ্যটা দেখে আমার মনটা ভালো হয়ে গেল। কিন্তু আমি কয়দিন আগেও এসব লক্ষ করতাম না।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখি একটা কুকুর তার লেজ নাড়িয়ে একটা শিশুর কাছে যাচ্ছে। শিশুটি খিলখিল করে হাসছে। সেই হাসি শুনে আমিও অজান্তে হেসে ফেললাম। এই সহজ, নির্মল আনন্দ – এটা কি আমার মতো জটিল চিন্তাভাবনার চেয়ে বেশি মূল্যবান?
চায়ের দোকানে বসে দেখি দোকানদার তার ছোট ছেলেকে চা বানানো শেখাচ্ছে। ছেলেটা খুব গর্বের সাথে চা ঢালছে। বাবার চোখে গর্ব, ছেলের চোখে আনন্দ। এই সাধারণ মুহূর্তটা কি একটা বড় সাফল্যের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ?
মার্কেটে গিয়ে দেখি একজন ফল বিক্রেতা তার স্ত্রীকে ফোনে বলছে, “আজকে ভালো কাম হইছে। ছেলের জন্য ভালো আম নিয়ে আসব।” তার কণ্ঠে যে তৃপ্তি, সেটা কি আমার প্রমোশনের আনন্দের চেয়ে কম খাঁটি?
বৃষ্টির দিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখি রাস্তার শিশুরা বৃষ্টিতে ভিজে নাচছে। তাদের মুখে যে আনন্দ, সেটা কোনো দামি খেলনার চেয়ে বেশি উজ্জ্বল। আমি কখন থেকে বৃষ্টিকে “অসুবিধা” মনে করা শুরু করেছি?
পার্কে সন্ধ্যায় দেখি একজন বৃদ্ধ দম্পতি বেঞ্চে বসে হাতে হাত রেখে আছেন। কোনো কথা বলছেন না, শুধু একসাথে আছেন। তাদের নীরবতায় যে গভীর সন্তুষ্টি, সেটা কি আমাদের উচ্চ আওয়াজের আনন্দের চেয়ে কম?
হাসপাতালে গিয়ে দেখি একজন রোগী ডাক্তারের কাছে শুনেছেন তিনি সুস্থ হয়ে গেছেন। তার মুখের আনন্দ দেখে মনে হল, সুস্থতা কত বড় পাওয়া। আমি প্রতিদিন সুস্থ আছি, কিন্তু এই সুস্থতার জন্য কখন শেষবার কৃতজ্ঞতা বোধ করেছি?
ট্রেনে যেতে যেতে দেখি একজন যুবক তার মাকে জানালার পাশে বসিয়ে দিচ্ছে। মা বলছেন, “এত সুন্দর দৃশ্য!” ছেলে খুশি হয়ে বলছে, “মা, আরো অনেক জায়গা দেখাব।” মায়ের সাধারণ খুশিতে ছেলের এত আনন্দ – এটা কি কোনো ব্যয়বহুল উপহারের চেয়ে কম মূল্যবান?
রিকশায় উঠে দেখি রিকশাওয়ালা গুনগুন করে গান গাইছেন। তার জীবনে হয়তো অনেক কষ্ট, কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি গান গাইছেন। তার এই সরল আনন্দ কি আমার জটিল সুখের চেয়ে কম সুন্দর?
আমার মনে হয়, জীবনের ছোট আনন্দগুলো আসলে ছোট নয়। আমাদের বড় করে দেখার চোখ ছোট হয়ে গেছে। আমরা খুঁজে বেড়াই বিরাট সুখ, আর হাতের নাগালের সাধারণ আনন্দগুলো এড়িয়ে যাই।
সকালের চায়ের স্বাদ, সন্ধ্যার শীতল বাতাস, রাতে আরাশের ঘুমন্ত মুখ দেখা – এগুলো কি আমার লক্ষ টাকার স্বপ্নের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ?
হ্যাপির হাসি, জামিউরের বন্ধুত্ব, সাইফুলের আন্তরিকতা – এগুলো কি আমার সামাজিক স্ট্যাটাসের চেয়ে কম মূল্যবান?
রবিবার সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা, ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা, গরম ভাত আর ডালের স্বাদ – এগুলো কি আমার ক্যারিয়ারের সাফল্যের চেয়ে কম অর্থবহ?
আমার মনে হয়, ছোট আনন্দগুলোর মহত্ত্ব এই যে এগুলো সহজলভ্য, কিন্তু অমূল্য। এগুলো কিনতে হয় না, অর্জন করতে হয় না। শুধু লক্ষ করতে হয়, অনুভব করতে হয়।
বড় সুখ আসে যায়, ছোট আনন্দ সবসময় আছে। বড় সুখ নির্ভর করে পরিস্থিতির উপর, ছোট আনন্দ নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির উপর।
একটা প্রমোশন পেতে বছর লাগে, কিন্তু একটা ফুলের সুগন্ধ পেতে সেকেন্ড লাগে। একটা বড় বাড়ি কিনতে কোটি টাকা লাগে, কিন্তু সূর্যাস্তের সৌন্দর্য দেখতে কিছুই লাগে না।
হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এই যে আমরা অসাধারণের খোঁজে সাধারণের মহত্ত্ব হারিয়ে ফেলি। আমরা দূরের স্বর্গ খুঁজতে গিয়ে কাছের স্বর্গ দেখতে পাই না।
আজকে থেকে আমি চেষ্টা করব সকালের পাখির গান শুনতে। চেষ্টা করব রাস্তার শিশুদের হাসি লক্ষ করতে। চেষ্টা করব হ্যাপির ছোট ছোট যত্নগুলো অনুভব করতে।
কারণ এই ছোট আনন্দগুলোই হয়তো জীবনের আসল সম্পদ। যেগুলো আমাদের প্রতিদিন দেওয়া হয়, কিন্তু আমরা গ্রহণ করতে ভুলে যাই।
এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, আমি হয়তো আমার চোখ খোলার একটা চেষ্টা করছি। সেই চোখ যেটা ছোট আনন্দের মহত্ত্ব দেখতে পায়। যেটা বুঝতে পারে যে সবচেয়ে বড় সুখ হয়তো সবচেয়ে সাধারণ জিনিসগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
একটু ভাবনা রেখে যান