বসের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। দরজায় নক করতে সাহস পাচ্ছি না।
হ্যাপির মার মৃত্যুর পর এক সপ্তাহ হয়ে গেল। বাড়ি যেতে হবে। তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে।
গতকাল ফোন করে বসকে বলেছিলাম। “স্যার, দুই দিনের ছুটি লাগবে।”
“অফিসে এসে কথা বলুন।” বলেছিলেন।
এসেছি। কিন্তু ভিতরে যেতে পারছি না।
নক করলাম। “আসুন।”
ঢুকে গেলাম। বস ফাইল দেখছেন। মাথা তুলে তাকালেন না।
“বসুন।”
বসলাম। পাঁচ মিনিট চুপ। বস কাগজ দেখছেন। আমি বসে আছি।
“কী চান?” অবশেষে জিজ্ঞেস করলেন।
“স্যার, আমার শাশুড়ি মারা গেছেন। বাড়ি যেতে হবে। দুই দিনের ছুটি…”
“আবার ছুটি?”
আবার? গত তিন মাসে একদিনও ছুটি নিইনি।
“স্যার, এটা জরুরি।”
“সবাই বলে জরুরি। আপনাদের কাছে সবকিছুই জরুরি।”
“স্যার, শাশুড়ি মারা গেছেন। এটা…”
“জানি। কিন্তু অফিসের কাজ? প্রজেক্ট? আপনি গেলে কে করবে?”
কে করবে? যে কেউ পারবে। আমার কাজ এতো বিশেষ কিছু নয়।
“স্যার, শুক্রবার রবিবার দুইদিন। সোমবার চলে আসব।”
“আর যদি দেরি হয়? যদি অসুখ করেন? যদি কিছু হয়?”
যদি, যদি, যদি। হাজারটা যদি।
“হবে না স্যার। নিশ্চিত।”
বস চেয়ার ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকালেন। আমি অপেক্ষা করলাম।
“আপনার কাজের মান কমে গেছে। ভুল বেড়ে গেছে। মনোযোগ নেই।”
ভুল? কোন ভুল? আমি সাবধানে কাজ করি।
“স্যার, কোন ভুল?”
“গত সপ্তাহে রিপোর্টে ভুল ছিল। আগের সপ্তাহে হিসাবে।”
গত সপ্তাহে? আগের সপ্তাহে? মনে পড়ছে না।
“স্যার, আমি সংশোধন করে দেব।”
“সংশোধন? আগে ভুল কেন?”
কেন? মানুষ ভুল করে। আমিও মানুষ।
“স্যার, হ্যাপির মার অসুখ ছিল। মন খারাপ ছিল।”
“অফিসে ব্যক্তিগত সমস্যা আনবেন না।”
চুপ হয়ে গেলাম। আর কী বলব?
“দেখুন, আমি মানুষ। বুঝি পারিবারিক সমস্যা। কিন্তু অফিসেরও দায়িত্ব আছে।”
“হ্যাঁ স্যার।”
“আপনি যাবেন। কিন্তু মনে রাখবেন, এই ছুটি আপনার পারফরমেন্স রিপোর্টে যাবে।”
পারফরমেন্স রিপোর্ট? শাশুড়ির মৃত্যু পারফরমেন্স রিপোর্টে যাবে?
“স্যার, এটা তো…”
“কিছু বলার নেই। আপনিই বলেছেন জরুরি। তাহলে দায় নিন।”
“স্যার, আমি…”
“আর কিছু?”
আর কী বলব? মাথা নিচু করে বসে রইলাম।
“যেতে পারেন।”
উঠে দাঁড়ালাম। “ধন্যবাদ স্যার।”
ধন্যবাদ? কিসের ধন্যবাদ? আমার আত্মসম্মান কেড়ে নেওয়ার জন্য?
বাইরে এসে বুঝলাম আমি ভিখারি। ছুটির ভিখারি। বসের করুণার ভিখারি।
নিজের ডেস্কে বসে ভাবলাম। আমি কী করলাম? কেন মাথা নিচু করে সব শুনলাম? কেন প্রতিবাদ করলাম না?
কারণ আমার চাকরি দরকার। এই চাকরিই আমার একমাত্র ভরসা। এই চাকরি হারালে আমি কিছুই না।
বাড়ি এসে হ্যাপিকে বললাম, “ছুটি পেয়েছি।”
“বস কী বলেছেন?”
কী বলব? বলব যে বস আমাকে ছোট করেছে? বলব যে আমি কাকুতি-মিনতি করে ছুটি নিয়েছি?
“কিছু না। ছুটি দিয়েছেন।”
মিথ্যা কথা।
রাতে শুয়ে ভাবলাম। কেন এমন হতে হয়? কেন ছুটি নিতে গিয়ে আত্মসম্মান হারাতে হয়?
আমি কি মানুষ নই? আমার কি পরিবার নেই? আমার কি দুঃখ নেই?
নাকি চাকরি করতে হলে এসব ভুলে থাকতে হয়? মানুষ হওয়া বন্ধ করতে হয়?
জানি না। শুধু জানি, কাল বাড়ি যাব। কিন্তু এই অপমানের ক্ষত বয়ে নিয়ে যাব।
একটু ভাবনা রেখে যান