ব্লগ

এক ক্লিকে অনন্তকাল

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“অর্ডার কনফার্ম করা হয়েছে। ১০-১৫ মিনিটে ডেলিভারি পাবেন।”

একটা ক্লিক। শুধু একটা ক্লিক। আর এখন আমি বসে আছি জানালার পাশে, রাস্তার দিকে তাকিয়ে। প্রতিটা বাইকের আওয়াজে আমার মনে হয় – “এসেছে!”

হ্যাপি বলল, “কী অর্ডার করলি?” “বিরিয়ানি।” “রান্না করতাম, কী হত?” আমি বললাম, “আজ মন চাইছিল না।” সত্যি কথা হচ্ছে, রান্নার জন্য ৪৫ মিনিট লাগত। আর অর্ডার করলে ১৫ মিনিট। কিন্তু এই ১৫ মিনিট কেন ৪৫ মিনিটের চেয়ে দীর্ঘ লাগছে?

আরাশ বলল, “বাবা, আমিও খাব।” আমি বললাম, “হ্যাঁ, তোর জন্যও অর্ডার করেছি।” কিন্তু মনে মনে ভাবলাম – আরো ৮ মিনিট পার হয়ে গেছে। এখনো আসেনি।

ফোনে ট্র্যাকিং চেক করলাম। “আপনার অর্ডার প্রস্তুত হচ্ছে।” প্রস্তুত হচ্ছে মানে? এখনো বানানো হয়নি? নাকি বানানো শেষ? এই অস্পষ্টতাটা আমাকে পাগল করে দিচ্ছে।

মনে পড়ল, ছোটবেলায় আমরা কোনো উৎসবের জন্য সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করতাম। ঈদের জন্য পুরো রমজান মাস। পুজোর জন্য সারা বছর। তখন অপেক্ষাটাই ছিল আনন্দের অংশ।

আর এখন? ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে পারছি না। হাতে ফোন নিয়ে বার বার রিফ্রেশ করছি। যেন আমার আঙুলের চাপেই ডেলিভারি ছেলেটা দ্রুত আসবে।

“Order on the way” – এই নোটিফিকেশনটা দেখে একটু শান্তি পেলাম। কিন্তু এখন নতুন চিন্তা – ওই ছেলেটা আমার বাসাটা খুঁজে পাবে তো? ঠিক খাবারটা নিয়ে এসেছে তো? গরম আছে তো?

১৮ মিনিট হয়ে গেছে। আমার মধ্যে একটা অভিমান কাজ করছে। ১০-১৫ মিনিট বলেছিল। এখন ১৮। মানে ওরা মিথ্যা বলেছে।

হঠাৎ বাইকের আওয়াজ। আমি দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম। ডেলিভারি ছেলেটা ঘামে ভিজে হাঁপাচ্ছে। “স্যরি সার, একটু ট্রাফিক ছিল।”

খাবার হাতে নিতেই আমার সব রাগ, সব অভিমান উবে গেল। একটা তৃপ্তির হাসি মুখে এসে গেল। যেন আমি বিরাট কিছু অর্জন করেছি।

খেতে বসে ভাবলাম – এই ১৮ মিনিট অপেক্ষায় আমার যে অস্থিরতা হয়েছে, সেই শক্তি দিয়ে আমি নিজেই একটা বিরিয়ানি বানিয়ে ফেলতে পারতাম।

কিন্তু সেটা করিনি কেন? কারণ আমি এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে অপেক্ষা মানেই হার। যেখানে ধৈর্য মানেই পিছিয়ে থাকা। যেখানে “এখনই চাই” মানেই উন্নতি।

আরাশ বলল, “বাবা, বিরিয়ানি খুব টেস্টি।” আমি হাসলাম। কিন্তু মনে মনে ভাবলাম – এই স্বাদের জন্য যে আমি ১৮ মিনিত অস্থির হয়েছি, সেই অস্থিরতার স্বাদটা কেমন ছিল?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *