আজ সাইফুলের অফিসে বসে তার নতুন গেমটা দেখছিলাম। গ্রাফিক্স এত বাস্তবসম্মত যে একসময় ভুলেই গেলাম এটা ভার্চুয়াল জগৎ। গেমের ভেতরের মানুষগুলো হাঁটছে, কথা বলছে, কাজ করছে—ঠিক আমাদের মতোই।
“এগুলো কি জানে যে এরা গেমের ভেতরে?” আমি সাইফুলকে জিজ্ঞেস করলাম।
সাইফুল হেসে বলল, “এরা তো প্রোগ্রাম। কিছু জানে না।”
“কিন্তু যদি এদের চেতনা থাকে? যদি এরা মনে করে এদের জীবন বাস্তব?”
সাইফুল আমার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকাল। “তুই আবার কী ভাবছিস?”
আমি বললাম, “ভাবছি—আমরা কি এরকম কোনো গেমের ভেতরে আছি?”
সাইফুল থতমত খেয়ে গেল। “মানে?”
“মানে আমাদের এই জীবন, এই পৃথিবী—এটা কি আসলে কোনো উন্নত সভ্যতার তৈরি সিমুলেশন?”
বাসায় ফিরে এই চিন্তা মাথা থেকে যাচ্ছে না। আমি যা দেখছি, যা অনুভব করছি—এগুলো কি আসলেই বাস্তব? নাকি কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রামের অংশ?
হ্যাপিকে বললাম, “তুমি কি কখনো ভেবেছো—আমাদের এই জীবন হয়তো বাস্তব নয়?”
“কেমন বাস্তব নয়?”
“হয়তো আমরা কোনো কম্পিউটারের ভেতরে আছি। কোনো উন্নত এলিয়েন বা ভবিষ্যতের মানুষ আমাদের সিমুলেট করেছে।”
হ্যাপি হেসে বলল, “তাহলে আমার রান্নার ব্যথা, তোমার চাকরির চিন্তা—এগুলো নকল?”
আমি ভাবলাম। হ্যাঁ, যদি আমরা সিমুলেশনে থাকি, তাহলে আমাদের সব অনুভূতিই প্রোগ্রামড।
কিন্তু তাহলে কি? আমার ব্যথা তো আমার কাছে বাস্তব। আমার ভালোবাসা তো আমার কাছে সত্যি।
আরাশ এসে বলল, “বাবা, কী নিয়ে কথা বলছো?”
আমি বললাম, “ভাবছি—আমাদের পৃথিবী হয়তো কোনো বড় কম্পিউটার গেম।”
আরাশ উত্সাহিত হয়ে বলল, “তাহলে আমরা ক্যারেক্টার? কে খেলছে?”
“জানি না। হয়তো কোনো উন্নত প্রাণী। হয়তো ভবিষ্যতের মানুষ।”
আরাশ বলল, “তাহলে আমার পরীক্ষার ফলাফল কি আগে থেকেই ঠিক করা?”
এই প্রশ্নে আমি থমকে গেলাম। যদি আমরা সিমুলেশনে থাকি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কি পূর্বনির্ধারিত? আমাদের কি কোনো স্বাধীন ইচ্ছা আছে?
রাতে শুয়ে আরো ভাবলাম। যদি এই তত্ত্ব সত্যি হয়, তাহলে কী প্রমাণ থাকবে?
হয়তো মাঝে মাঝে গ্লিচ হবে। যেমন কম্পিউটার গেমে হয়। দেজাভু কি সেরকম গ্লিচ? যখন মনে হয় এটা আগেও হয়েছে?
হয়তো পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো আসলে প্রোগ্রামিং কোড। কোয়ান্টাম ফিজিক্সের অদ্ভুততা কি কম্পিউটেশনাল লিমিটেশন?
আমার মনে পড়ল—সাইফুল বলেছিল, “আজকাল কম্পিউটার এত শক্তিশালী হচ্ছে যে একদিন পুরো একটা ইউনিভার্স সিমুলেট করা যাবে।”
তাহলে কি আমরা সেই ভবিষ্যতের কোনো এক্সপেরিমেন্ট?
কিন্তু তারপর আরেকটা চিন্তা এলো। যদি আমরা সিমুলেশনে থাকি, তাহলে যারা আমাদের সিমুলেট করছে, তারাও কি কোনো সিমুলেশনে থাকতে পারে?
এভাবে চিন্তা করলে তো অসংখ্য স্তরের সিমুলেশন হতে পারে। তাহলে আসল বাস্তবতা কোনটা?
পরদিন জামিউরের সাথে এই নিয়ে কথা হলো। সে বলল, “ধর তোর কথা ঠিক। আমরা সিমুলেশনে আছি। তাহলে কী করবি?”
আমি ভাবলাম। সত্যিই তো। জানলে কী হবে?
“কিছুই করার নেই,” আমি বললাম। “আমাকে তো এই জীবন নিয়েই কাজ করতে হবে।”
জামিউর বলল, “তাহলে এই চিন্তা করে কী লাভ?”
আমি বুঝলাম—জামিউর ঠিক বলেছে। আমি সিমুলেশনে থাকি বা বাস্তবে থাকি, আমার কাছে তো এই জীবনই একমাত্র জীবন।
আমার ভালোবাসা, আমার দুঃখ, আমার স্বপ্ন—এগুলো আমার কাছে সত্যি। এগুলোর মূল্য কমে যায় না শুধু এই কারণে যে হয়তো এগুলো প্রোগ্রামড।
আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি যদি জানতে যে তুমি একটা গেমের ক্যারেক্টার, তাহলে কী করতে?”
আরাশ বলল, “আমি সবচেয়ে ভালো ক্যারেক্টার হওয়ার চেষ্টা করতাম।”
আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এগারো বছরের ছেলের এই উত্তর।
হ্যাপিকে বললাম, “আরাশ আমার চেয়ে জ্ঞানী।”
“কেন?”
“সে বুঝেছে—আমরা সিমুলেশনে থাকি বা বাস্তবে থাকি, আমাদের দায়িত্ব একই। ভালো মানুষ হওয়া।”
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেয়ে এই জীবনকে অর্থপূর্ণ করার চেষ্টা করবো।
আমি সিমুলেশনে থাকি বা বাস্তবে থাকি, আমার পরিবার আমার কাছে সত্যি। আমার দায়িত্ব আমার কাছে সত্যি। আমার ভালোবাসা আমার কাছে সত্যি।
আর এই সত্যতাই যথেষ্ট।
কারণ শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমি কীভাবে বাঁচি। কী ভালোবাসি। কী অবদান রাখি।
এসব প্রশ্নের উত্তর একই—সিমুলেশনে হোক বা বাস্তবে হোক।
একটু ভাবনা রেখে যান