ব্লগ

সমাজের একা যোদ্ধার কমেডি শো

নভেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আমি ভেবেছিলাম হিরো হব। সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াব। কিন্তু আবিষ্কার করলাম, এই সমাজে হিরো হওয়া মানে সবার কাছে জোকার হওয়া।

গল্পটা শুরু হয় যখন আমি দেখলাম পাড়ার প্রভাবশালী মিয়া সাহেব গরিবদের জমি দখল করছে। ভাবলাম, “এবার কিছু একটা করতে হবে।”

প্রথমে গেলাম এলাকার শিক্ষিত লোকদের কাছে।

ডাক্তার সাহেব: “ভাই, আমি শুধু রোগী দেখি। রাজনীতি বুঝি না।” (কিন্তু মিয়া সাহেবের ছেলের বিয়েতে গিয়ে ৫০,০০০ টাকা গিফট দিয়েছে)

ইঞ্জিনিয়ার সাহেব: “এসব কমপ্লিকেটেড ব্যাপার। আমি টেকনিক্যাল লাইনে।” (মিয়া সাহেবের কন্ট্রাক্টে ১০ লাখ টাকার কাজ করেছে)

শিক্ষক সাহেব: “ছাত্রদের পড়াতে ব্যস্ত।” (মিয়া সাহেবের নাতি ক্লাসে ফেল করলেও পাস করিয়ে দেয়)

তারপর গেলাম ধর্মীয় নেতাদের কাছে।

ইমাম সাহেব: “আল্লাহ সব দেখেন। আল্লাহর উপর ছেড়ে দিন।” (মসজিদের জমি মিয়া সাহেবের নামে)

পীর সাহেব: “ধৈর্য ধরেন। দোয়া করবেন।” (মিয়া সাহেব তার বড় মুরিদ)

রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গেলাম।

বিরোধী দলের নেতা: “সরকার সব দুর্নীতি করে।” (কিন্তু মিয়া সাহেব বিরোধী দলকেও টাকা দেয়)

সরকারি দলের নেতা: “মিথ্যা অভিযোগ। প্রমাণ কী?” (মিয়া সাহেব তার ইলেকশনের ফান্ড দেয়)

মিডিয়ায় গেলাম।

সম্পাদক: “আমরা নিরপেক্ষ সংবাদ দিই। একপক্ষীয় কিছু পারি না।” (মিয়া সাহেবের পেপারে বিজ্ঞাপন দেয়)

টিভি রিপোর্টার: “স্যার, এটা তো লোকাল ইস্যু। আমরা জাতীয় নিউজ করি।” (মিয়া সাহেবের ছেলের বার্থডে পার্টি কভার করেছে)

সিভিল সোসাইটির কাছে গেলাম।

এনজিও প্রধান: “আমরা শুধু নারী ও শিশু নিয়ে কাজ করি।” (মিয়া সাহেবের স্ত্রীর মাধ্যমে ডোনেশন পায়)

মানবাধিকার কর্মী: “আমাদের এখন রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ব্যস্ততা।” (মিয়া সাহেবের প্রোগ্রামে চিফ গেস্ট হয়)

এবার গেলাম সাধারণ মানুষের কাছে।

দোকানদার: “ভাই, আমি ব্যবসা করি। এসব ঝামেলায় যেতে পারি না।” (মিয়া সাহেবের কাছ থেকে দোকান ভাড়া নিয়েছে)

রিকশাওয়ালা: “সাহেব, আমরা গরিব মানুষ। বুঝি না এসব।” (মিয়া সাহেবের গুন্ডারা তাকে রুট দেয়)

গৃহিণী: “এসব পুরুষমানুষের কাজ। আমি বুঝি না।” (মিয়া সাহেবের বউয়ের কিটি পার্টির মেম্বার)

সবশেষে গেলাম আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।

থানার ওসি: “আপনার কাছে প্রমাণ আছে? সাক্ষী আছে?” (মিয়া সাহেব তার ছেলের চাকরিতে সাহায্য করেছে)

ম্যাজিস্ট্রেট: “এটা সিভিল ম্যাটার। আদালতে যান।” (মিয়া সাহেবের আইনজীবী তার বন্ধু)

আদালতে গেলাম।

বিচারক: “পক্ষের আইনজীবী কোথায়?” (আমার কাছে আইনজীবীর টাকা নেই, মিয়া সাহেবের ১০ জন আইনজীবী)

তখন আমি বুঝলাম, এই সমাজে আসলে দুই ধরনের মানুষ আছে।

এক ধরন: মিয়া সাহেব – যারা অন্যায় করে।

আরেক ধরন: বাকি সবাই – যারা মিয়া সাহেবের অন্যায়ে হাততালি দেয় না, কিন্তু সুবিধাটা ভাগ করে নেয়।

আমি তৃতীয় ধরনের মানুষ – যে না বুঝে এই দুই দলের বিরুদ্ধে যেতে চায়।

সবাই আমাকে পাগল ভাবতে শুরু করল। বলল, “তুমি একা কী করবে?”

আমি বললাম, “অন্তত চেষ্টা তো করতে পারি।”

তারা হাসল। “চেষ্টা করে লাভ কী? সিস্টেম তো ঠিক হবে না।”

আমি বুঝলাম, এই সমাজে সবাই সিস্টেমের শিকার হওয়ার নাটক করে। কিন্তু আসলে সবাই সিস্টেমের সুবিধাভোগী।

ডাক্তার মিয়া সাহেবের টাকায় ভালো প্র্যাকটিস করে। শিক্ষক মিয়া সাহেবের প্রভাবে ভালো স্কুলে চাকরি পায়। ইমাম মিয়া সাহেবের দানে মসজিদ চালায়। রিকশাওয়ালা মিয়া সাহেবের এলাকায় নিরাপদে কাজ করে।

সবাই মিয়া সাহেবের বিরুদ্ধে কথা বলে, কিন্তু তার সুবিধা নেয়।

আর আমি? আমি হলাম সেই বোকা, যে এই খেলার নিয়ম বুঝি না।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা হলো, সেটা আরো মজার।

আমি একা একা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতে থাকলাম। ছবি তুলে পোস্ট করলাম। ভিডিও বানালাম।

শুরুতে কেউ শেয়ার করল না। শেষেও কেউ করল না।

বরং উল্টো হলো।

মিয়া সাহেব আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করল। “মানহানি” বলে।

পুলিশ এসে আমাকে নিয়ে গেল। কেউ সাক্ষী দিল না। সবাই বলল, “আমরা কিছু দেখিনি।”

জামিনের জন্য যাদের কাছে গিয়েছিলাম, তারা বলল:

ডাক্তার: “আপনি তো সমস্যায় পড়েছেন। আমি এখন সাহায্য করতে পারব না।”

শিক্ষক: “আফসোস! বলেছিলাম চুপ থাকতে।”

ইমাম: “আল্লাহর ইচ্ছা। ধৈর্য ধরুন।”

জেল থেকে বেরিয়ে দেখি, আমার চাকরি নেই। বাড়িওয়ালা বাড়ি ছাড়তে বলেছে। “আমার বাড়ির নাম খারাপ হবে।”

ছেলের স্কুল থেকে ডেকে বলল, “আপনার ছেলেকে ভর্তি রাখতে পারব না। অন্য বাচ্চাদের উপর খারাপ প্রভাব পড়বে।”

স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলল, “এখন কী হবে? কোথায় যাব?”

আমার কোনো উত্তর নেই।

এলাকায় চলাফেরা করলে মানুষ দূরে সরে যায়। যেন আমি কোনো ছোঁয়াচে রোগী।

দোকানদার বলে, “ক্যাশে দেন।” আগে চেনা মুখে উধার দিত।

রিকশাওয়ালা ভাড়া বেশি নেয়। “আপনার তো সমস্যা আছে।”

এমনকি মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে মানুষ পাশে দাঁড়ায় না।

আমি বুঝলাম, এই সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে নিজেকে শেষ করে দেওয়া।

আর মিয়া সাহেব? সে আরো শক্তিশালী হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে জিতে গেছে বলে।

এখন আমি বসে আছি একটা ছোট ভাড়া ঘরে। কোনো চাকরি নেই। কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই।

মাঝে মাঝে ভাবি, সবাই ঠিক বলেছিল। “চুপ থাকলেই ভালো ছিল।”

কিন্তু তারপর আয়নায় তাকাই। নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবি, “অন্তত আমি জানি আমি সৎ।”

এটাই বোধহয় একা দাঁড়ানোর পুরস্কার। সবার কাছে হেরে যাওয়া, কিন্তু নিজের কাছে জেতা।

তবে পেট ভরে না এই জেতায়। আর সমাজও পরিবর্তন হয় না।

মিয়া সাহেবরা থেকে যায়। আর আমাদের মতো বোকারা গল্প হয়ে থাকি।

“ওই যে লোকটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, দেখো কী হাল!”

এই গল্পই বলে পরের প্রজন্মকে, “চুপ থাকা ভালো।”

আর এভাবেই চলতে থাকে সমাজের চাকা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

ব্লগ

সুখ

নভেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *