কথা

মৃত্যু

অক্টোবর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া
শেয়ার

তুমি মরছ। প্রতিদিন।

গতকাল রাতে আয়নায় দেখেছিলাম একজনকে। ক্লান্ত মুখ। চোখ লাল। কাঁধ ঝুলে আছে।

আজ সকালে আবার দেখলাম। অন্য কেউ। চোখ পরিষ্কার। মুখে শক্তি।

একই আয়না। ভিন্ন মানুষ।

গতকাল যে ছিল, সে কোথায়?

মরে গেছে।

স্ত্রী চা এনে দিল। বলল, “আজ ভালো লাগছে।”

“কাল?”

“মরা মনে হয়েছিল।”

“ঠিক বলেছ। মরেই ছিলাম।”

সে হাসল। “আবার শুরু?”

“শুরু না। সত্য।”

চুমুক দিলাম। জিভ পুড়ল। ব্যথা লাগল।

ব্যথা মানে বেঁচে আছি। এই মুহূর্তে।

কিন্তু যে চা খাচ্ছে, সে কে? গতকাল যে ছিল তার সাথে এর কী সম্পর্ক?

কিছু না। নামটা এক। শরীরটা এক। কিন্তু মানুষ ভিন্ন।

তুমি জানো না এটা। তাই দুঃখ পাও।

গতকালের ব্যর্থতা আজও বয়ে বেড়াও। গতকালের অপমান আজও বুকে।

কিন্তু গতকাল যে অপমানিত হয়েছিল, সে মরে গেছে। তুমি না সে।

তবু বয়ে বেড়াও। কেন? কারণ ভুলে গেছ তুমি প্রতিদিন মরো।

রাতে ঘুম মানে কী?

চোখ বন্ধ করো। যে জেগে ছিল, সে চলে যায়। কোথায়? জানো না। কখনো ফিরবে? না।

স্বপ্ন আসে। অন্য জগত। অন্য কেউ উড়ছে। ডুবছে। চিৎকার করছে।

সে কে? তুমি বলো।

কিন্তু তুমি তো জানো না তুমি উড়তে পারো না। তাহলে যে উড়ছে সে কে?

অন্য কেউ। তোমার নাম ধার করে বেঁচে আছে। কয়েক ঘণ্টা।

তারপর মরে যায়।

সকালে চোখ খোলো। নতুন কেউ জাগে।

তুমি বলো, “আমি।”

কিন্তু কোন আমি? গতকালের? পরশুর? নাকি একদম নতুন?

নতুন। সবসময়।

তুমি শুধু ভান করো যে তুমি একই আছো। কারণ ভয় লাগে।

ভয় লাগে যদি জানো প্রতিদিন মরছ। তাই নাম ধরে রাখো। শরীর ধরে রাখো। “আমি অমুক” — এই গল্প ধরে রাখো।

কিন্তু গল্প মাত্র।

সত্য হল — তুমি আজ জন্মেছ। আজই প্রথম।

ছেলে এসে বসল। বলল, “আমি কাল রাতে কে ছিলাম?”

“তুমিই তো।”

“না। স্বপ্নে আমি উড়ছিলাম। আমি জানি আমি উড়তে পারি না। তাহলে?”

চুপ করে রইলাম।

সে বলল, “আমি মরে গিয়েছিলাম?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে এখন?”

“নতুন জন্ম।”

“তাহলে আমার বয়স কত?”

“কত মনে হয়?”

“একদিন। আজ জন্মেছি।”

শিশুরা জানে। তারপর ভুলে যায়। বড় হয়। বলে, “আমার বয়স তিরিশ। চল্লিশ। পঞ্চাশ।”

মিথ্যা। তোমার বয়স একদিন। আজ জন্মেছ। কাল মরবে।

অফিসে একটা সমস্যা ছিল। গতকাল সারাদিন ভেবেছিলাম। পারিনি।

আজ সকালে জানলাম।

কীভাবে? গতকাল যে ভাবছিল, সে মরে গেছে। আজ যে জাগল, সে নতুন। তার মাথা নতুন।

পুরনো সমস্যা তার নেই। তাই সমাধান পেয়েছে।

তুমি এই খেলা খেলছ প্রতিদিন। কিন্তু জানো না।

স্ত্রী বলল, “গতকাল আমার ওপর রেগে ছিলে।”

“ছিলাম।”

“এখন?”

“নেই।”

“এত তাড়াতাড়ি মিটে গেল?”

“মেটেনি। যে রেগে ছিল, সে মরে গেছে। আমি অন্য কেউ।”

সে হাসল। “তাহলে তো কেউ দায়ী না।”

“না। কেউ দায়ী না। সবাই মরে যায়।”

হাসি থামল। “এভাবে ভাবলে তো সব ভেঙে পড়ে।”

“হ্যাঁ। ভেঙে পড়ে। কিন্তু ভাঙার পরই তো দেখা যায় কী আছে।”

“কী আছে?”

“কিছু না। শুধু এই মুহূর্ত।”

শিশুকে দেখি। প্রতিদিন বদলায়। গতকাল এক খেলা। আজ আরেক খেলা।

জিজ্ঞেস করলাম, “তুই প্রতিদিন বদলাস কেন?”

“বদলাই না। প্রতিদিন নতুন হই।”

“পার্থক্য কী?”

“বদলানো মানে আগের থেকে ভিন্ন হওয়া। নতুন হওয়া মানে আগের কেউ ছিল না।”

থমকে গেলাম।

সে বলল, “বুড়ো হওয়া মানে কী বাবা?”

“শরীর দুর্বল হওয়া।”

“না। বুড়ো হওয়া মানে ভুলে যাওয়া তুমি প্রতিদিন নতুন।”

শিশুরা জানে সত্য। তারপর আমরা শেখাই তাদের মিথ্যা। বলি — তুমি একই আছ। তোমার নাম এটা। তোমার বয়স এটা। এভাবে থাকো।

তারা শেখে। ভুলে যায় সত্য। হয়ে ওঠে আমাদের মতো। মৃত।

বারান্দায় দাঁড়ালাম।

গাছে পুরনো পাতা ঝরছে। নতুন গজাচ্ছে।

পুরনো না ঝরলে নতুন আসে না।

গাছ জানে। তুমি জানো না।

তুমি পুরনো ধরে রাখো। বলো — “এটা আমার। ছাড়ব না।”

পুরনো রাগ। পুরনো কষ্ট। পুরনো গর্ব।

সব ধরে রাখো। তাই নতুন আসে না।

গাছ ছেড়ে দেয়। তাই নতুন পায়।

তুমি ছাড়ো না। তাই মরে থাকো।

রাতে শুয়ে আছি।

স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলেও।

আমি জেগে।

ভাবছি — আজকের এই আমি আর কত সময়?

কয়েক ঘণ্টা হয়তো।

তারপর মরে যাবে।

কালকে অন্য কেউ জাগবে। আমার নাম নিয়ে। আমার শরীর নিয়ে।

কিন্তু আমি না।

আমি চলে যাব। কোথায়? জানি না। কখনো ফিরব? না।

ভয় লাগছে।

ভয় লাগে জানলে তুমি মরছ।

কিন্তু ভয়ই সত্য। যা ভয়াবহ, তাই সত্য।

সান্ত্বনা মিথ্যা। আশ্বাস মিথ্যা। “সব ঠিক হবে” মিথ্যা।

সত্য হল — তুমি মরছ। এখনই। এই মুহূর্তে।

প্রতি নিঃশ্বাসে একটু করে। প্রতি ধড়কনে একটু করে।

তারপর চোখ বন্ধ করবে। একদম মরে যাবে।

কালকে অন্য কেউ জাগবে। তোমার কথা মনেও রাখবে না।

চোখ বন্ধ করলাম।

ঘুম আসছে। মৃত্যু আসছে।

আজকের আমি শেষ হয়ে যাচ্ছে।

হাত পা ভারী হচ্ছে। শ্বাস ধীর হচ্ছে।

চলে যাচ্ছি।

এই শেষবার।

আর ফিরব না।

সকাল।

চোখ খুলল কারো।

আলো আসছে জানালা দিয়ে। পাখি ডাকছে।

কে জাগল?

নতুন কেউ।

গতকাল যে ছিল, সে নেই। মরে গেছে। ঘুমের মধ্যে।

এখন অন্য কেউ। নতুন।

উঠে বসল। আয়নায় তাকাল।

চিনল না নিজেকে। তারপর মনে পড়ল — নাম, বয়স, পরিচয়।

পরল মুখোশ। হয়ে গেল “আমি।”

কিন্তু জানে না সে আজ জন্মেছে। আজই প্রথম।

স্ত্রী ডাকল, “চা?”

“হ্যাঁ।”

চা এল। চুমুক দিল।

স্বাদ পেল। মিষ্টি।

এই স্বাদ নতুন। কারণ যে পাচ্ছে, সে নতুন।

গতকাল যে চা খেয়েছিল, সে মরে গেছে।

স্ত্রী বলল, “তুমি ভালো আছ?”

“আছি।”

“নিশ্চিত?”

“আজকের আমি ভালো আছে। গতকালের জানি না। সে তো নেই।”

সে হাসল। “আবার শুরু?”

“শুরু কীসের? সত্য বলছি।”

ছেলে এল। বলল, “আমিও চা খাব।”

“তুই দুধ খাস।”

“না। আমি বড় হয়ে গেছি।”

“কবে?”

“আজ সকালে। আগে যে ছিল, সে ছোট ছিল। আমি বড়।”

তিনজনে চা খেলাম।

তিনজনই আজ জন্মেছে। কিন্তু দুজন জানে না।

শুধু ছেলে জানে। এখনো।

কতদিন পর ভুলে যাবে? কতদিন পর শিখবে মিথ্যা?

বারান্দায় গেলাম। রাস্তায় মানুষ।

সবাই যাচ্ছে কোথাও।

সবাই আজ জন্মেছে। কেউ জানে না।

সবাই মনে করে তারা কাল যারা ছিল, আজও তারা।

মিথ্যা। কাল যারা ছিল, তারা মরে গেছে। রাতে।

আজ নতুন মানুষ। কিন্তু পরেছে পুরনো নাম। পুরনো কাপড়। পুরনো পরিচয়।

তাই চেনা লাগছে।

কিন্তু ভেতরে অচেনা। একদম নতুন।

স্ত্রী এল পাশে। বলল, “কী দেখছ?”

“মৃত মানুষ। বেঁচে আছে ভেবে।”

“তুমিও?”

“হ্যাঁ। আমিও। তুমিও। সবাই।”

“তাহলে?”

“তাহলে কিছু না। শুধু দেখছি।”

সে আমার হাত ধরল। হাত গরম। জীবিত।

কিন্তু কার হাত? যে ধরেছে, সে কে? আজ সকালে জন্মেছে।

কালকে মরে যাবে। তারপর অন্য কেউ আসবে।

হাত ছাড়ব? না। এই মুহূর্তে ধরে আছি। এইটুকুই সত্য।

কালকে কে ধরবে জানি না। আজ আমি ধরছি।

ছেলে এসে দাঁড়াল। বলল, “বাবা, আমরা কি প্রতিদিন জন্মদিন পালন করতে পারি?”

“কেন?”

“কারণ প্রতিদিন জন্ম হয়।”

“তুই ঠিকই বলেছিস। পালন কর।”

“কীভাবে?”

“জেগে ওঠ। জানো তুমি নতুন। এইটুকু। এটাই উদযাপন।”

সে ভাবল। তারপর হাসল।

রাতে আবার শুয়ে আছি।

স্ত্রী বলল, “তুমি ভয় পাও?”

“কীসের?”

“মরতে। প্রতি রাতে।”

“হ্যাঁ। পাই।”

“তাহলে?”

“তাহলে কিছু না। ভয় পাই। তবুও ঘুমাই। কারণ ঘুম না হলে বাঁচা হয় না।”

“মরা না হলে বাঁচা হয় না?”

“হ্যাঁ। এটাই নিয়ম। মর। তবে বাঁচবে।”

সে চুপ। তারপর বলল, “কালকে যে জাগবে, সে কে হবে?”

“জানি না।”

“তুমি?”

“হয়তো। হয়তো না। কিন্তু আমার নাম নেবে। আমার শরীর নেবে। তাই মনে হবে আমি।”

“কিন্তু আসলে?”

“আসলে অন্য কেউ। নতুন।”

চোখ বন্ধ করলাম।

ঘুম আসছে। মৃত্যু আসছে।

আজকের আমি মরছি।

শ্বাস নিচ্ছি। কয়টা বাকি?

হাত পা ছাড়ছি। শরীর ছাড়ছি। নাম ছাড়ছি।

চলে যাচ্ছি।

ভয় লাগছে। কিন্তু যাচ্ছি।

কোথায়? জানি না।

ফিরব? না।

কালকে অন্য কেউ আসবে। আমার জায়গায়।

কিন্তু আমি না।

আমি চলে গেছি। এখনই। এই মুহূর্তে।

মরছি।

শেষ নিঃশ্বাস।

বন্ধ হল চোখ।

গেল।

সকাল।

কেউ জাগল।

নতুন।

আজই প্রথম।

চোখ খুলল। দেখল আলো।

উঠল। দাঁড়াল। হাঁটল।

নিল চা। খেল।

জানল না সে আজ জন্মেছে।

মনে করল — আমি কাল যে ছিলাम, আজও আমি।

মিথ্যা।

কাল যে ছিল, সে মরে গেছে।

আজ নতুন।

কিন্তু জানে না।

তাই দুঃখ।

তাই ভয়।

তাই জীবন।

তুমি।

আত্মউপলব্ধি আত্মোন্নতি আশা জীবন-দর্শন পরিবর্তন

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

সংখ্যা

ডিসেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া

জীবন

তাড়া

অক্টোবর ২০২৫ · 12 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *