ব্লগ

ডেডলাইনের ভয়ে আক্রান্ত হয়ে জীবনযাপন

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ বুঝলাম আমার পুরো জীবনটাই ডেডলাইনের ভয়ে কাঁপছে। প্রতিটা দিন একটা না একটা শেষ তারিখের দিকে দৌড়াচ্ছি। আর সেই দৌড়ে আমি এত ক্লান্ত যে জীবনের আনন্দ অনুভব করার সময়ই পাই না।

আজ আরাশের স্কুলের ফি জমা দেওয়ার শেষ দিন। কাল বিদ্যুতের বিল পরিশোধের শেষ দিন। পরশু আয়কর রিটার্নের শেষ তারিখ। প্রতিদিন কোনো না কোনো ডেডলাইন আমার গলায় ফাঁস হয়ে ঝুলছে।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মাথায় হিসেব চলে। আগামীকাল কোন ডেডলাইন? পরের সপ্তাহে কী কী শেষ হবে? আগামী মাসে কোন কাগজের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে?

এই চিন্তায় ঘুম আসে না। আর ঘুম না আসলে পরের দিন ক্লান্ত থাকি। ক্লান্ত থাকলে কাজ ঠিকমতো করতে পারি না। আর আরও ডেডলাইন মিস করি।

হ্যাপি বলে, “তুমি সবসময় তাড়াহুড়া কেন?” আমি বলি, “সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।” কিন্তু কোন সময়? আমি নিজেও জানি না।

আমার মনে হয় ডেডলাইন একটা অদৃশ্য দানব। সবসময় আমার পেছনে দৌড়ায়। আমি যত দ্রুত দৌড়াই, সেও তত দ্রুত দৌড়ায়।

অফিসে প্রতিটা কাজের ডেডলাইন আছে। “এই কাজ আগামীকালের মধ্যে।” “এই রিপোর্ট সন্ধ্যার মধ্যে।” “এই ফাইল দুপুরের মধ্যে।”

আমি সারাদিন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকি। সময় কত? কত বাকি? ডেডলাইন কাছে আসছে?

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার সময়ও মনে হয় এর একটা ডেডলাইন আছে। নামাজের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। দোয়া করার সময় কম।

আরাশ বলে, “আব্বু, আপনি কেন এত তাড়াতাড়ি খান?” আমি বলি, “সময় নেই।” কিন্তু আসলে সময় নেই কেন? ডেডলাইনের ভয়ে আমি সব তাড়াতাড়ি করি।

এই ভয়ে আমি কখনো শান্তিতে একটা কাজ করতে পারি না। সবসময় মনে হয় আরও তাড়াতাড়ি করতে হবে। আরও দ্রুত শেষ করতে হবে।

খাওয়ার সময় মনে হয় তাড়াতাড়ি খেতে হবে। ঘুমের সময় মনে হয় তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হবে। এমনকি আরাম করার সময়ও মনে হয় তাড়াতাড়ি আরাম করতে হবে।

আমার জীবনে “আস্তে আস্তে” বলে কিছু নেই। সবকিছু তাড়াতাড়ি। কারণ ডেডলাইন।

কিছু ডেডলাইন আছে যেগুলো আমি নিজেই তৈরি করেছি। “আজকের মধ্যে এই কাজ শেষ করব।” “এই মাসের মধ্যে ওই কাজ করব।” তারপর সেই ডেডলাইনের ভয়ে কাঁপি।

সবচেয়ে বড় ডেডলাইন হলো জীবনের ডেডলাইন। মৃত্যু। এটা ভাবলে আরও ভয় লাগে। কত সময় বাকি? কতটুকু কাজ করতে পারব?

এই ভয়ে আমি কখনো বর্তমানে বাঁচি না। সবসময় ভবিষ্যতের ডেডলাইনের চিন্তায় থাকি।

হ্যাপির সাথে কথা বলার সময় মনে হয় এর জন্য যে সময় দিচ্ছি, সেই সময়ে অন্য কোনো ডেডলাইনের কাজ করতে পারতাম।

আরাশের সাথে খেলার সময় মনে হয় অন্য কোনো জরুরি কাজ আছে। ডেডলাইন আছে।

রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি, আগামীকাল আবার নতুন ডেডলাইন। আরও তাড়াহুড়া। আরও ভয়।

আর এভাবে ডেডলাইনের ভয়ে ভয়ে একদিন আমার জীবনের ডেডলাইন এসে যাবে। কিন্তু আমি কখনো শান্তিতে একটা মুহূর্ত কাটাতে পারব না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *