আজ সকালে গুগল ম্যাপস আমাকে বলল আমার অফিস যেতে ১৮ মিনিট লাগবে, ট্রাফিক একটু বেশি। আমি অবাক হলাম – আমি তো বলিনি আমি অফিস যাব? তারপর মনে পড়ল, আমি প্রতিদিন এই সময় অফিস যাই। গুগল দেখছে, শিখছে, জানছে।
প্রাইভেসি মরে গেছে। আমিই হত্যাকারী।
অফিসে পৌঁছে দেখি এক সহকর্মী প্রাইভেসি নিয়ে অভিযোগ করছে। “আজকাল কোনো গোপনীয়তা নেই। সব কোম্পানি আমাদের তথ্য চুরি করে।” আমি তার ফোনের দিকে তাকালাম – ফেসবুক খোলা, লাইভ লোকেশন শেয়ার করছে।
“তুমি তো নিজেই সব শেয়ার করছ।”
“সেটা আলাদা ব্যাপার। আমি শেয়ার করতে চাই বলে করছি।”
কিন্তু সত্যিই কি চাইছে? নাকি অভ্যাস হয়ে গেছে?
বাড়ি ফিরে আরাশকে দেখি সে তার আর্ট পোস্ট করছে ইনস্টাগ্রামে। “তুই কি জানিস এই ছবি কোথায় কোথায় যাবে?”
“না বাবা। কিন্তু আমি চাই মানুষ আমার কাজ দেখুক।”
“কিন্তু তোর প্রাইভেসি?”
আরাশ একটু ভেবে বলল, “বাবা, প্রাইভেসি মানে কি লুকিয়ে থাকা? আমি তো মানুষের সাথে কানেক্ট হতে চাই।”
আমার ভিতরে একটা অ্যাপ আপডেট হলো। নাম “প্রাইভেসির নতুন সংজ্ঞা ভার্সন ১.০”।
হ্যাপির সাথে রাতে কথা বলছিলাম। “আমাদের কি প্রাইভেসি আছে?”
“কীরকম প্রাইভেসি?”
“মানে, আমাদের কথাবার্তা, যাতায়াত, কেনাকাটা – সব তো রেকর্ড হয়।”
হ্যাপি বলল, “হায়দার, আমার বাবার সময়ে প্রতিবেশীরা জানত তিনি কখন ঘর থেকে বের হন, কোথায় যান। এখন গুগল জানে। পার্থক্য কী?”
“মানে?”
“মানে, তখনও প্রাইভেসি ছিল না। এখনও নেই। পরিবর্তন হয়েছে কে দেখছে।”
আমি ভাবলাম। সত্যিই কি প্রাইভেসি আছে? আমি যখন মসজিদে যাই, পাড়ার মানুষ দেখে। আমি যখন দোকানে কিছু কিনি, দোকানদার জানে। আমি যখন বন্ধুর সাথে কথা বলি, সে শোনে।
তাহলে অনলাইন প্রাইভেসি নিয়ে এত চিন্তা কেন?
পরদিন রহিম চাচার সাথে এই নিয়ে কথা বলছিলাম। তিনি বলললেন, “বাবা, আমাদের সময়ে মানুষ দেখত, কিন্তু তারা আমাদের চিনত। এখন যন্ত্র দেখে, কিন্তু তোমাকে চেনে না।”
“মানে?”
“মানে, আমি জানি তুমি সৎ মানুষ। কিন্তু অ্যালগরিদম জানে তুমি কী সার্চ করো। কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?”
আমি বুঝলাম। প্রাইভেসি মরেনি। পরিবর্তন হয়েছে কে আমাদের জানে।
আগে যারা আমাদের দেখত, তারা আমাদের বিচার করত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। এখন যারা দেখছে, তারা বিচার করে ডেটা দিয়ে।
রাতে নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। আল্লাহর কাছে আমার কোনো প্রাইভেসি নেই। তিনি আমার প্রতিটি চিন্তা জানেন। কিন্তু এতে আমার কোনো ভয় নেই। কারণ আমি জানি তিনি আমাকে ভালোবাসেন।
কিন্তু গুগল বা ফেসবুক আমাকে ভালোবাসে না। তারা আমাকে ব্যবহার করে।
এটাই হয়তো আসল সমস্যা। প্রাইভেসি না থাকা নয়, বরং যারা দেখছে তাদের উদ্দেশ্য।
আরাশকে বললাম, “তুই যখন তোর আর্ট শেয়ার করিস, তুই জানিস কেন করিস। কিন্তু যারা তোর ডেটা নেয়, তুই জানিস না তারা কেন নিচ্ছে।”
“তাহলে আমি কী করব?”
“সচেতন হয়ে শেয়ার করিস। জানিস কী শেয়ার করছিস, কেন করছিস।”
হ্যাপিকে বললাম, “প্রাইভেসি বিলুপ্ত হয়নি। আমরা সেটা বিক্রি করে দিয়েছি।”
“কী দামে?”
“সুবিধার দামে। ফ্রি ইমেইল, ফ্রি সোশ্যাল মিডিয়া, ফ্রি ম্যাপ।”
কিন্তু এর মানে এই নয় যে আমরা হাল ছেড়ে দেব। প্রাইভেসি আর লুকিয়ে থাকার নাম নয়। প্রাইভেসি হলো নিজের তথ্যের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখা।
আমি স্থির করলাম – আমি সচেতনভাবে শেয়ার করব। যা শেয়ার করতে চাই না, সেটা করব না। আর যা করি, সেটা জেনেবুঝে করব।
প্রাইভেসি মৃত নয়। প্রাইভেসি ঘুমিয়ে আছে। আমাদের জাগাতে হবে।
একটু ভাবনা রেখে যান