মৃদুলের মেসেজটা আসার সাথে সাথেই আমি পড়ে ফেললাম। কানাডা থেকে লিখেছে – “ভাই, খুব কষ্টে আছি। একটু কথা বলতে পারি?” নীচে লেখা “Seen 2:47 PM”।
আমি ফোনটা পকেটে রেখে দিলাম।
কেন? কেন আমি উত্তর দিলাম না? আমার হাতে সময় আছে। মৃদুল আমার ভালো বন্ধু। ও কষ্টে আছে। তাহলে কোন অদৃশ্য দেয়াল আমাকে টাইপ করতে দিচ্ছে না?
হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “কার মেসেজ?” আমি বললাম, “মৃদুলের।” “কী বলেছে?” “কিছু না, এমনি।” এই মিথ্যাটা মুখ থেকে বেরিয়ে আসতেই আমার নিজেকে অপরাধী মনে হল।
আরাশ বলল, “বাবা, মৃদুল মামা কেমন আছে?” আমি বললাম, “ভালো আছে।” আরেকটা মিথ্যা। আমি নিজেই জানি না ও কেমন আছে, কারণ আমি উত্তর দিইনি।
সন্ধ্যেয় আবার ফোন চেক করলাম। মৃদুল আরো একটা মেসেজ দিয়েছে – “ভাই, জানি ব্যস্ত আছো। পরে কথা হবে।” এই বার আমার বুকটা কেমন যেন হল। ও বুঝে গেছে যে আমি দেখেছি কিন্তু উত্তর দিইনি।
রাতে শুয়ে ভাবলাম – এই “দেখেছি” ফিচারটা কী এক ভয়ানক জিনিস। আগে যখন চিঠি আসত, পড়ার পর উত্তর লেখার জন্য সময় নিতে পারতাম। কেউ জানত না আমি কবে পড়েছি। আর এখন? এখন আমার প্রতিটি পড়া, প্রতিটি উপেক্ষা রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে – আমি কেন উত্তর দিইনি?
হয়তো আমি ভেবেছি, ওর কষ্টের সাথে আমার কী করার? হয়তো ভেবেছি, আমার নিজের কষ্টই তো সামলাতে পারি না। হয়তো ভেবেছি, কানাডায় ওর সমস্যা আমি এখানে বসে কীভাবে সমাধান করব?
নাকি আমি এমন একজন হয়ে গেছি যে অন্যের কষ্ট দেখতে পায় কিন্তু অনুভব করতে পারে না? নাকি আমার মধ্যেকার সেই সহানুভূতিশীল মানুষটা কোথাও হারিয়ে গেছে?
পরের দিন সকালে ওকে ফোন করলাম। “মৃদুল, কেমন আছিস?” ও বলল, “এখন ভালো।” কিন্তু ওর গলায় একটা দূরত্ব ছিল। যেন আমার গতকালের নীরবতা আমাদের বন্ধুত্বে একটা ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে।
আমি বুঝলাম, “দেখেছি” শুধু একটা স্ট্যাটাস না। এটা একটা চুক্তি। আমি যখন দেখি, তখন আমি একটা নৈতিক দায়বদ্ধতার মধ্যে পড়ে যাই। আর সেই দায়বদ্ধতা এড়িয়ে গেলে আমি শুধু একটা মেসেজেরই উত্তর দিই না – আমি একটা সম্পর্কের উপর আঘাত হানি।
কিন্তু তবু আমি প্রতিদিন কত মেসেজ “দেখেছি” করে রেখে দিই। কত মানুষের কণ্ঠস্বরকে নীরবতায় চাপা দিই।
এই যন্ত্র যুগে “দেখেছি” মানে দেখিনি – এটা কী এক উল্টো সত্য!
একটু ভাবনা রেখে যান