ব্লগ

দেরির কারণ খোঁজার অসহায়তা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“দেরি কেন?” হ্যাপির এই সহজ প্রশ্নের উত্তরে আমি দাঁড়িয়ে যাই। কারণ এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। আমি জানি না কেন দেরি হয়েছে। জানি না কীভাবে সময়ের এই হিসেব এত ভুল হয়ে গেল। যেন আমি একটা জটিল গাণিতিক সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ভেবেছিলাম আধঘণ্টায় অফিস পৌঁছে যাব। কিন্তু দেড় ঘণ্টা পর বাড়ি ফিরছি। এই এক ঘণ্টা কোথায় গেল? আমি কী করেছি এই সময়ে?

ট্রাফিক জ্যাম। এটাই প্রথম অজুহাত যেটা মনে আসে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, ট্রাফিক জ্যাম তো সব সময়ই থাকে। তাহলে আমি কেন হিসেব করি না এই সময়টা?

অফিসের কাজ দেরি হয়েছে। এটাও একটা কারণ। কিন্তু সেই কাজ তো আগেও ছিল। আমি জানতাম যে এই কাজ করতে সময় লাগবে। তাহলে কেন তাড়াতাড়ি শুরু করিনি?

বাসে বসে ভাবছিলাম এই দেরির প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে। সকালে বাথরুমে অতিরিক্ত ১০ মিনিট ছিলাম। কেন? কোনো জরুরি প্রয়োজন ছিল না। শুধু ফোনে ফেসবুক দেখছিলাম।

নাশতা খেতে ১৫ মিনিট বেশি সময় নিয়েছি। কারণ টিভিতে একটা খবর দেখছিলাম। সেই খবর কি এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে তার জন্য দেরি করার দরকার ছিল?

অফিসে পৌঁছে প্রথমে চা খেয়েছি। সহকর্মীদের সাথে গল্প করেছি। তারপর ইমেইল চেক করেছি। এসব তো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয়। কিন্তু তবুও সময় নিয়েছে।

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমি সময়ের হিসেব রাখতে পারি না? কেন আমার ধারণা আর বাস্তবতার মধ্যে এত পার্থক্য?”

মনে হয় আমি সময়ের একজন খারাপ বিচারক। আমি যেটা মনে করি ১০ মিনিটে হবে, সেটা হয় ২০ মিনিটে। যেটা মনে করি আধঘণ্টায় হবে, সেটা হয় এক ঘণ্টায়।

এই সমস্যা শুধু আমার একার নাকি সবারই? আমার বন্ধুদের সাথে কথা বলে জেনেছি তাদেরও একই অবস্থা। সবাই পরিকল্পনা করি এক সময়ে পৌঁছানোর, কিন্তু পৌঁছাই অন্য সময়ে।

হ্যাপি বলে, “তুমি সব সময় দেরি কর।” এই কথায় আমার খারাপ লাগে। কারণ আমি ইচ্ছা করে দেরি করি না। আমি চাই সময়মতো পৌঁছাতে। কিন্তু পারি না।

আরাশ বলে, “আব্বু, আপনি টাইম ম্যানেজমেন্ট শিখুন।” তার এই পরামর্শ শুনে হাসি পায়। এগারো বছরের একটা বাচ্চা আমাকে টাইম ম্যানেজমেন্ট শেখানোর পরামর্শ দিচ্ছে।

কিন্তু সে ঠিকই বলেছে। আমার টাইম ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা খুবই খারাপ। আমি সময়ের গুরুত্ব বুঝি, কিন্তু সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারি না।

একদিন একটা পরীক্ষা করলাম। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রতিটি কাজের জন্য কত সময় লেগেছে সেটা লিখে রাখলাম। দেখলাম আমার ধারণা আর বাস্তবতার মধ্যে বিরাট পার্থক্য।

গোসল করতে ভেবেছিলাম ১৫ মিনিট লাগবে, লেগেছে ৩০ মিনিট। অফিসে যেতে ভেবেছিলাম ৩০ মিনিট লাগবে, লেগেছে ৪৫ মিনিট। প্রতিটি কাজেই আমার ধারণা ভুল।

এই যে সময়ের ভুল হিসেব, এর পেছনে কি কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে? আমি কি অতিরিক্ত আশাবাদী? নাকি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন?

হয়তো আমার সমস্যা হল আমি সময়কে একটা স্থির বিষয় মনে করি। ভাবি যে সব সময় একই গতিতে চলে। কিন্তু বাস্তবে ট্রাফিক, আবহাওয়া, মানুষের আচরণ – সব কিছুই সময়ের গতি পরিবর্তন করে।

দেরির জন্য যখন অজুহাত খুঁজি, তখন নিজের কাছেই অপরাধী মনে হই। কারণ আমি জানি যে অজুহাতগুলো সত্যি হলেও, মূল সমস্যা আমারই। আমার পরিকল্পনায় ভুল।

কখনো কখনো মনে হয় সময় আমার শত্রু। আমি যতই চেষ্টা করি, সেটা আমাকে হারিয়ে দেয়। কিন্তু তারপর বুঝি যে সময় কারো শত্রু নয়। সময় সবার জন্য সমান।

আজকাল চেষ্টা করি বেশি সময় হিসেব করে রাখতে। যেটা মনে হয় ৩০ মিনিট লাগবে, সেটার জন্য ৪৫ মিনিট রাখি। কিন্তু তবুও মাঝে মাঝে দেরি হয়।

হয়তো এটাই আমার চরিত্রের একটা অংশ। আমি দেরি করার মানুষ। এটা পরিবর্তন করা যাবে কিনা জানি না। কিন্তু চেষ্টা করে যাচ্ছি। “দেরি কেন?” – এই প্রশ্নের আরো ভালো উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

ব্লগ

আয়না

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *