রাত নয়টা। অফিস থেকে বের হলাম। সবাই চলে গেছে। আমি একা।
পকেট থেকে ফোন বের করলাম। হ্যাপির তিনটা মিসড কল। একটা মেসেজ: “কখন আসবে? আরাশ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
অপরাধবোধ। বুকের ভিতর ভারি হয়ে উঠল।
রাস্তায় গাড়ি কম। দোকানপাট বন্ধ। সবাই বাড়ি ফিরে গেছে। শুধু আমি রাস্তায়।
বাসে উঠলাম। যাত্রী কম। সবাই ক্লান্ত। আমিও ক্লান্ত। কিন্তু মনের ক্লান্তি বেশি।
জানালা দিয়ে তাকালাম। একটা ফ্ল্যাটের জানালায় আলো। পরিবার একসাথে খাচ্ছে। বাবা, মা, ছেলেমেয়ে। সবাই হাসছে।
আমার আরাশও কি এখনও অপেক্ষা করছে? নাকি ঘুমিয়ে পড়েছে?
আজ সকালে আরাশ বলেছিল, “বাবা, আজ তাড়াতাড়ি এসো। আমার হোমওয়ার্ক করাবে।”
বলেছিলাম, “অবশ্যই।”
মিথ্যা কথা। জানতাম আজ দেরি হবে। নতুন প্রজেক্ট। বস বলেছেন আজই শেষ করতে হবে।
ফোন বাজল। হ্যাপি।
“কোথায়?”
“বাসে। এখনই পৌঁছাব।”
“আরাশ ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেক অপেক্ষা করেছে।”
গলার স্বরে অভিমান। হ্যাপি রাগ করে না। কিন্তু অভিমান করে। সেটা আরও খারাপ।
“সরি। অফিসে কাজ ছিল।”
“জানি। তবু…”
কথা শেষ করল না। কিন্তু বুঝতে পারলাম কী বলতে চেয়েছে। পরিবারেরও তো একটা দাম আছে।
বাড়ি পৌঁছালাম। দরজা খুলে দিল হ্যাপি। মুখে কোনো হাসি নেই।
“খেয়েছো?” জিজ্ঞেস করল।
“না।”
“গরম করে দেই।”
আরাশের ঘরে গেলাম। ঘুমিয়ে আছে। তার পাশে খাতা-কলম। নিশ্চয়ই আমার জন্য অপেক্ষা করে করে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আস্তে করে তার কপালে হাত রাখলাম। কত নরম। কত সুন্দর।
“মাফ করো বেটা।” মনে মনে বললাম।
খেতে বসলাম। হ্যাপি পাশে বসল। চুপচাপ। এই নিরবতা কথার চেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
“আজ তোমার কী কী করেছো?” জিজ্ঞেস করলাম।
“আরাশকে পড়িয়েছি। তোমার জন্য খাবার তৈরি করেছি। অপেক্ষা করেছি।”
অপেক্ষা। সারাদিন অপেক্ষা।
“কাল থেকে তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করব।”
“কতবার বলেছো এই কথা?”
সত্যি। কতবার বলেছি। কিন্তু পারি না। অফিসের কাজ শেষ না করে আসতে পারি না।
“এই প্রজেক্ট শেষ হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
হ্যাপি কিছু বলল না। জানে যে আবার নতুন প্রজেক্ট আসবে। আবার দেরি হবে।
রাতে শুয়ে ভাবলাম। আমি কার জন্য কাজ করি? পরিবারের জন্য। কিন্তু পরিবারের সময় দিতে পারছি না।
আরাশ বড় হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন একটু একটু করে। আমি মিস করছি সেই মুহূর্তগুলো। যখন সে নতুন কিছু শেখে। যখন সে প্রশ্ন করে। যখন সে আমার গল্প শুনতে চায়।
হ্যাপিও একা হয়ে যাচ্ছে। সারাদিন একা ঘরে। একা রান্না। একা অপেক্ষা।
এই কাজ কি এতো গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রজেক্ট কি আমার পরিবারের চেয়ে বেশি দরকারী?
জানি না। শুধু জানি, আমি আটকে গেছি। কাজ আর পরিবারের মাঝখানে আটকে গেছি।
দুটোই চাই। দুটোই হারাচ্ছি।
একটু ভাবনা রেখে যান