রোজ বিকেলে দেখি। পার্কের একই বেঞ্চে একই বুড়ো। একা বসে থাকে। কখনো কখনো মুখ নাড়ে। যেন কারো সাথে কথা বলছে। কিন্তু কেউ নেই।
আজ কাছে গিয়ে শুনলাম।
“হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছো। ছেলেটা আর ফোন করে না।”
কার সাথে কথা? ফিরে তাকালাম। কেউ নেই।
“কার সাথে কথা বলছেন?”
“স্ত্রীর সাথে। ওই যে বসে আছে।”
আমি খালি বেঞ্চ দেখি। তিনি অন্য কিছু দেখেন।
এই হলো বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা। এত গভীর যে মন নিজেই সাথী বানায়।
ওষুধের দোকানে দেখি। একটা বৃদ্ধা রোজ আসে। ফার্মাসিস্টের সাথে আধঘন্টা কথা বলে। মেডিসিন কেনে পাঁচ মিনিটে। কিন্তু থাকে আধঘন্টা।
“কেমন আছেন?”
“ভালো। তবে গতকাল রাতে একটু অসুবিধা…”
এভাবে শুরু। তারপর পুরো জীবনের গল্প। কাল কী খেয়েছে। কোথায় ব্যথা। কে ফোন করেছে। কে করেনি।
ফার্মাসিস্ট ধৈর্য নিয়ে শোনে। বোঝে, এটা ওষুধ কেনা নয়। এটা একাকীত্বের চিকিৎসা।
বাজারে দেখি। একটা দাদু সবজি কিনে। দু’টো আলু। একটা টমেটো। একজনের খাবার।
দোকানদার জিজ্ঞেস করে, “আর কিছু লাগবে?”
“না। একা তো। বেশি কিনলে নষ্ট হবে।”
একটা কথায় পুরো জীবনের গল্প।
হাসপাতালে দেখি। একটা বুড়ি ডাক্তারের কাছে। সমস্যা মামুলি। কিন্তু দীর্ঘ বর্ণনা দেয়।
“ডাক্তার সাহেব, রাতে ঘুম হয় না। একা একা ভয় লাগে।”
ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দেয়। কিন্তু ঘুমের সমস্যা নয়। একাকীত্বের সমস্যা।
মসজিদে দেখি। নামাজের পর কিছু বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকে। কথা বলে। যেন যেতে ইচ্ছে করে না।
“কেমন আছেন?”
“ভালো। তবে বাড়িতে একা…”
একটা কথায় সব বলে দেয়।
রিকশায় দেখি। একটা দাদা রিকশাওয়ালাকে বলে, “ধীরে চালাও ভাই। তাড়া নেই।”
কোথায় যাচ্ছে? কোনো গন্তব্য নেই। শুধু ঘোরাঘুরি। যাতে কিছুক্ষণ কারো সাথে থাকা যায়।
ফোনের দোকানে দেখি। একটা বৃদ্ধা ফোন কার্ড কিনে। জিজ্ঞেস করি, “কাকে ফোন করবেন?”
“যে যে নাম্বার মনে আছে।” হাসে। “দেখি কেউ কথা বলে কি না।”
এলাকায় দেখি। একটা দাদু রোজ ছাদে ওঠে। নিচে তাকিয়ে থাকে। আশা করে কেউ ডাকবে।
কিন্তু কেউ ডাকে না। সবাই ব্যস্ত। নিজেদের নিয়ে।
বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা কেমন? যেমন একটা দ্বীপে একা। চারদিকে পানি। কোনো নৌকা নেই।
কিন্তু এই মানুষেরা মানিয়ে নেয় কেমন করে?
নিজেই নিজের সাথী হয়ে যায়। নিজেই নিজের সাথে কথা বলে। নিজেই নিজের যত্ন নেয়।
কেউ টিভির সাথে কথা বলে। “এই নায়কটা বোকা। এমন করবে কেন?”
কেউ গাছের সাথে কথা বলে। “আজ একটু বেশি পানি দিলাম। কেমন লাগছে?”
কেউ ছবির সাথে কথা বলে। “আজ তোমার নাতি ফোন করেছে।”
এটাই হয়তো বেঁচে থাকার উপায়। যখন মানুষ ছেড়ে যায়, জিনিসের সাথে বন্ধুত্ব করা।
কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের কথা? এই একাকীত্ব নিজেরাই বেছে নেয় না। সমাজ দেয়।
ছেলেরা বলে, “আমাদের সাথে থাকো।” কিন্তু জায়গা দেয় না।
মেয়েরা বলে, “মাঝে মাঝে আসি।” কিন্তু আসে না।
আত্মীয়রা বলে, “খোঁজখবর রাখি।” কিন্তু রাখে না।
শেষে বুড়োরা বুঝে যায়, সবার কাছে তারা বোঝা।
তখন নিজেরাই নিজেদের সামলায়। শেখে একা থাকতে। একা হাসতে। একা কাঁদতে।
আর এভাবেই চলে যায় জীবনের শেষ অধ্যায়। একা।
কিন্তু দেখি, এরা হাল ছাড়ে না। রোজ উঠে। কাপড় পরে। বাইরে যায়। কারো সাথে দেখা হবে এই আশায়।
এই আশাটাই হয়তো বেঁচে রাখে।
বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতার সাথে মানিয়ে নেওয়া মানে আশা ছাড়া না দেওয়া।
আর সেই আশাই সবচেয়ে বড় সাহস।
একটু ভাবনা রেখে যান