ব্লগ

যে ভাষায় কথা বলি সেটা কি আদৌ আমার?

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ধার করা শব্দ

একটি কাল্পনিক গল্প


বাসের জানালার পাশে বসে নাজমুল সাহেব হঠাৎ একটা অদ্ভুত কথা ভাবলেন।

তিনি যে ভাষায় কথা বলেন, সেটা কি তাঁর?


পেছনের সিটে দুজন মানুষ কথা বলছে।

“ভাই, আজকে অফিসে কী ঝামেলা!” “কী হলো?” “বসের মেজাজ খারাপ ছিল।”

নাজমুল সাহেব শুনলেন।

এই শব্দগুলো — “ঝামেলা,” “মেজাজ,” “খারাপ” — এগুলো কি ঐ মানুষদের? নাকি কোটি মানুষ এই শব্দগুলো ব্যবহার করেছে আগে?

তাহলে এই কথোপকথনে নিজস্ব কী আছে?


বাসা থেকে বের হওয়ার আগে স্ত্রী শিরিনকে বলেছিলেন, “আমি যাচ্ছি।”

শিরিন বলেছিলেন, “ঠিক আছে।”

এই “আমি যাচ্ছি” — কতবার বলেছেন জীবনে? হাজারবার? লাখবার?

এই শব্দগুলো কি তাঁর? নাকি একটা সামাজিক প্রথা? একটা অভ্যাস?

যদি এই শব্দগুলো না বলতেন, কী হতো?

কিছুই না। শুধু একটু অদ্ভুত লাগতো।

কিন্তু অদ্ভুত কেন? কারণ সবাই এই শব্দ বলে। তিনিও বলেন। এটাই নিয়ম।


অফিসে পৌঁছালেন।

রিসেপশনিস্ট বললো, “গুড মর্নিং স্যার।”

নাজমুল সাহেব বললেন, “গুড মর্নিং।”

ইংরেজি শব্দ। কার শব্দ? ব্রিটিশদের? আমেরিকানদের? কর্পোরেট সংস্কৃতির?

তাঁর তো নয়।

কিন্তু তিনি বললেন। কারণ এটাই বলতে হয়।


ডেস্কে বসলেন। কম্পিউটার খুললেন।

সহকর্মী রাশেদ এলো।

“নাজমুল ভাই, ফাইলটা পেয়েছেন?” “হ্যাঁ, পেয়েছি।” “কেমন লাগলো?” “ভালো।”

“ভালো।”

এই শব্দটা কি সত্যিই তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে?

ফাইলটা আসলে কেমন লেগেছিল? বিরক্তিকর? জটিল? অপ্রয়োজনীয়?

কিন্তু তিনি বললেন “ভালো।” কারণ এটাই বলতে হয়। অফিসে সবাই বলে।


দুপুরে ক্যান্টিনে গেলেন।

“ভাত দেন।” “মাছ নেবেন?” “হ্যাঁ।” “ডাল?” “দিন।”

এই কথোপকথন প্রতিদিন হয়। একই শব্দ। একই বাক্য।

নাজমুল সাহেব ভাবলেন — এই জীবনে তিনি কতগুলো নতুন শব্দ বলেছেন?

এমন শব্দ যা আগে কেউ বলেনি?

একটাও না।

সব ধার করা।


বিকেলে বাসায় ফিরলেন।

শিরিন জিজ্ঞেস করলেন, “অফিস কেমন ছিল?”

“ভালো।”

আবার সেই “ভালো।”

“ক্লান্ত লাগছে?”

“হ্যাঁ, একটু।”

“চা খাবে?”

“দাও।”

এই সংলাপ তিনি শুনেছেন টিভিতে। পড়েছেন বইয়ে। দেখেছেন সিনেমায়।

এটা তাঁর জীবন নয়। এটা একটা স্ক্রিপ্ট। সবাই একই স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করছে।


ছেলে ইমন স্কুল থেকে ফিরেছে।

“পড়ালেখা কেমন চলছে?”

এই প্রশ্ন তাঁর বাবা তাঁকে করতেন। তাঁর বাবার বাবা তাঁর বাবাকে করতেন।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই প্রশ্ন।

ইমন বললো, “ভালো।”

আবার “ভালো।”

এই পরিবারে সবকিছু “ভালো।” কারণ অন্য কোনো শব্দ জানা নেই।


রাতে খেতে বসলেন।

শিরিন বললেন, “ভাত কম খাচ্ছ কেন?”

“খিদে নেই।”

“শরীর খারাপ?”

“না।”

“তাহলে?”

“এমনি।”

“এমনি” — এই শব্দটা কী বোঝায়?

কিছুই না? নাকি এমন কিছু যার জন্য শব্দ নেই?

নাজমুল সাহেব বুঝলেন — তাঁর মনে এমন অনেক কিছু আছে যার জন্য ভাষায় শব্দ নেই। তাই বলেন “এমনি।”


রাতে বিছানায় শুয়ে শিরিনকে বললেন, “তোমাকে ভালোবাসি।”

শিরিন হাসলেন। “আমিও।”

কিন্তু “ভালোবাসি” শব্দটা কি তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে?

এই শব্দ কোটি মানুষ কোটিবার বলেছে। সিনেমায়, গানে, কবিতায়।

তাঁর যে অনুভূতি শিরিনের জন্য — সেটার সঠিক শব্দ কী?

“ভালোবাসি” কি যথেষ্ট?

নাকি এটা একটা সংক্ষিপ্ত রূপ? আসল অনুভূতির একটা ছায়া?


পরদিন অফিসে একটা মিটিং ছিল।

বস বললেন, “আপনাদের মতামত দিন।”

নাজমুল সাহেব বললেন, “আমার মনে হয় প্রজেক্টটা ভালো হবে।”

এই বাক্যটা কি তাঁর মতামত?

নাকি একটা নিরাপদ উত্তর? যা সবাই বলে? যা বললে কেউ কিছু বলবে না?

তাঁর আসল মতামত কী ছিল?

তিনি জানেন না। কারণ আসল মতামত প্রকাশ করার শব্দ তাঁর জানা নেই।


একদিন নাজমুল সাহেব একটা পরীক্ষা করলেন।

পুরো একটা দিন কথা না বলে কাটানোর চেষ্টা করলেন।

সকালে শিরিনকে কিছু বললেন না। শুধু মাথা নাড়লেন।

অফিসে গিয়ে ইশারায় কাজ চালালেন।

কিন্তু বেশিক্ষণ পারলেন না।

মানুষ জিজ্ঞেস করতে লাগলো, “কী হয়েছে? কথা বলছেন না কেন?”

তিনি বাধ্য হলেন বলতে, “কিছু না, একটু গলা ব্যথা।”

আবার ধার করা শব্দ। মিথ্যা শব্দ।


সেই রাতে ভাবলেন — ভাষা ছাড়া কি বেঁচে থাকা যায়?

উত্তর পেলেন — যায় না।

মানুষ সামাজিক প্রাণী। ভাষা ছাড়া সমাজে টিকে থাকা অসম্ভব।

কিন্তু যে ভাষা সবার, সেই ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করা কি সম্ভব?

নাকি সবাই একটু একটু হারিয়ে যায় ভাষার ভিড়ে?


ইমন একদিন জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, তুমি কী ভাবো?”

নাজমুল সাহেব থমকে গেলেন।

কী ভাবেন?

যদি বলেন “তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি” — এটা তো সব বাবাই বলে।

যদি বলেন “অফিসের কাজ নিয়ে ভাবি” — এটাও সাধারণ।

তিনি আসলে কী ভাবেন?

এমন কিছু যা শুধু তাঁর?

“বাবা?”

“অনেক কিছু ভাবি।”

“কী কী?”

নাজমুল সাহেব উত্তর দিতে পারলেন না।

কারণ যা ভাবেন, তার জন্য শব্দ নেই।


একদিন পুরনো ডায়েরি খুঁজে পেলেন।

কুড়ি বছর আগের। কলেজ জীবনের।

পড়তে লাগলেন।

“আজ খুব কষ্ট লাগছে। জানি না কেন।” “জীবন মানে কী? বুঝি না।” “একা লাগছে। যদিও মানুষের মধ্যে আছি।”

এই শব্দগুলোও তো সবার। “কষ্ট,” “জীবন,” “একা” — কোটি মানুষ লিখেছে।

কিন্তু তখন মনে হয়েছিল এগুলো তাঁর নিজের কথা।

এখন?

এখন মনে হচ্ছে সবই ধার করা।


শিরিনকে একদিন বললেন এই কথা।

“আমার মনে হয় আমার নিজের ভাষা নেই।”

শিরিন অবাক হলেন। “মানে?”

“মানে আমি যা বলি, সব অন্যদের শব্দ। আমার নিজস্ব কিছু নেই।”

শিরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন, “তুমি যখন আমাকে প্রথম বলেছিলে ‘তোমাকে ভালোবাসি’ — সেটাও কি ধার করা ছিল?”

নাজমুল সাহেব উত্তর দিতে পারলেন না।

“আমি বলছি ছিল না। কারণ শব্দ এক হলেও অনুভূতি আলাদা। তোমার ‘ভালোবাসি’ আর অন্যদের ‘ভালোবাসি’ এক না।”


নাজমুল সাহেব ভাবলেন।

হয়তো শিরিন ঠিক বলেছেন।

শব্দ ধার করা। কিন্তু যখন সেই শব্দ মুখ থেকে বের হয়, তখন তার সাথে মেশে অনুভূতি। সেই অনুভূতি নিজস্ব।

একই “ভালোবাসি” শব্দ কোটি মানুষ বলে। কিন্তু প্রতিটা “ভালোবাসি” আলাদা।

কারণ যে বলছে, সে আলাদা।


কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়।

যে অনুভূতির জন্য শব্দ নেই, সেটা কি হারিয়ে যায়?

নাজমুল সাহেবের মনে এমন অনেক কিছু আছে যা তিনি কাউকে বলতে পারেন না। কারণ সঠিক শব্দ জানা নেই।

সেই অব্যক্ত অনুভূতিগুলো কোথায় যায়?

হয়তো বুকের ভেতরে জমে থাকে। চাপা পড়ে থাকে।

একদিন হয়তো বিস্ফোরণ ঘটে।

অথবা নীরবে মরে যায়।


আজ রাতে নাজমুল সাহেব একটা কাজ করলেন।

একটা কাগজে লিখতে বসলেন।

কিন্তু শব্দ নয়। শব্দ ছাড়া।

শুধু আঁকিবুঁকি। অর্থহীন দাগ। বাঁকা রেখা।

কেউ দেখলে বুঝবে না কী আঁকা।

কিন্তু নাজমুল সাহেব বুঝলেন।

এটা তাঁর ভাষা। যা কারো কাছ থেকে ধার করা নয়।

এটা শুধু তাঁর।


শিরিন জিজ্ঞেস করলেন, “কী আঁকছ?”

নাজমুল সাহেব হাসলেন।

“কিছু না।”

আবার সেই “কিছু না।”

কিন্তু এবার এই শব্দের মানে আলাদা।

এবার এটা সত্যি।

কিছু জিনিস শব্দে প্রকাশ করা যায় না।

সেগুলো শুধু অনুভব করা যায়।

এবং সেই অনুভব — সম্পূর্ণ নিজস্ব।


[এই গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *