রমজান মাস এসেছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছু খাওয়া যাবে না। পানিও না। এই নিয়ম মেনে চলতে হবে ত্রিশ দিন।
প্রথম দিন খুব কষ্ট লাগে। দুপুরে গলা শুকিয়ে যায়। পানি পিপাসা পায়। কিন্তু পান করতে পারি না। মনে হয় এই ত্রিশ দিন কিভাবে কাটাব?
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কয়েকদিন পর অভ্যাস হয়ে যায়। শরীর মানিয়ে নেয়। মন শক্তিশালী হয়। যেটা প্রথম দিন অসম্ভব মনে হয়েছিল, সেটা এখন সহজ।
এই ব্যাপারটা আমার জীবনের সাথে তুলনা করে দেখি। জীবনেও তো নানা রকম সবর করতে হয়।
অফিসে বসের বকা সহ্য করি। কাস্টমারদের খারাপ ব্যবহার সহ্য করি। কম বেতনে কাজ করি। এসবও তো এক ধরনের রোজা।
কিন্তু পার্থক্য হলো, রমজানের রোজার একটা শেষ আছে। ত্রিশ দিন পর ঈদ আসে। কিন্তু জীবনের এই কষ্টের শেষ কোথায়?
রোজা রাখার সময় আমি জানি, সন্ধ্যায় ইফতার আছে। তাই সহ্য করতে পারি। কিন্তু অফিসের কষ্ট সহ্য করার সময় জানি না এর শেষ কবে।
রোজার সময় ভাবি, এই কষ্ট আল্লাহর জন্য। তিনি দেখছেন। তিনি সওয়াব দেবেন। এই চিন্তা শক্তি দেয়।
কিন্তু অফিসের কষ্টের সময় ভাবি, এটা শুধু বেঁচে থাকার জন্য। পেট ভরানোর জন্য। এখানে কোনো আধ্যাত্মিক দিক নেই।
তাহলে কি আমি ভুল ভাবছি? অফিসের কষ্টও কি আল্লাহর জন্য সহ্য করা যায়?
আমি যদি ভাবি, আমি হালাল রিজিকের জন্য কষ্ট করছি, পরিবারের দায়িত্ব পালনের জন্য, তাহলে এটাও তো ইবাদত হতে পারে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “পরিবারের জন্য যে চেষ্টা করে, সেটাও সাদাকা।” তাহলে আমার অফিসের কষ্টও কি আল্লাহর কাছে সওয়াব?
রোজার সময় মিষ্টি দেখে লালসা হয়। কিন্তু খাই না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করি। এটা নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ।
জীবনেও তো নানা লালসা আসে। অন্যের টাকার লোভ, অন্যায় পথে আয়ের সুযোগ। কিন্তু সেগুলো থেকে বিরত থাকি। এটাও তো নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ।
রোজার সময় রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কেউ গালি দিলেও উত্তর দেওয়া যায় না। বলতে হয়, “আমি রোজাদার।”
জীবনেও তো রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। অফিসে বস অন্যায় বললেও চুপ থাকি। কাস্টমার খারাপ ব্যবহার করলেও হাসি মুখে সেবা করি।
তাহলে রোজা আমাকে শেখায় ধৈর্য। আর জীবন সেই ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়।
রোজার সময় শরীর দুর্বল হয়। কিন্তু মন শক্তিশালী হয়। উইল পাওয়ার বাড়ে। মনে হয় আমি অনেক কিছু পারি।
জীবনের কষ্টের সময়ও কি এমন হওয়া উচিত? কষ্ট সহ্য করে করে আমি কি আরো শক্তিশালী হচ্ছি?
রোজা ভাঙার সময় যে আনন্দ হয়, সেটা অবর্ণনীয়। মাগরিবের আজানের সাথে সাথে যখন প্রথম চুমুক পানি খাই, মনে হয় এর চেয়ে সুস্বাদু কিছু নেই।
জীবনের কষ্টের পরও কি এমন আনন্দ আসে? যখন কোনো সমস্যার সমাধান হয়, যখন কোনো কষ্টের শেষ হয়, তখন কি সেই আনন্দ পাই?
হ্যাপিকে এই তুলনা নিয়ে বলেছিলাম। হ্যাপি বলেছিল, “রোজা তো আল্লাহর হুকুম। কিন্তু জীবনের কষ্ট?”
আমি বলেছিলাম, “সেটাও তো আল্লাহর পরীক্ষা।”
হ্যাপি ভেবে বলেছিল, “তাহলে দুটোই সহ্য করতে হবে।”
রমজানে তারাবি নামাজ পড়ি। দোয়া করি। কোরআন পড়ি। মনে হয় আল্লাহর খুব কাছে আছি।
কিন্তু রমজানের বাইরে কি এই অনুভূতি থাকে? জীবনের কষ্টের সময় কি আল্লাহকে এত কাছে মনে হয়?
হয়তো এটাই আসল পরীক্ষা। রমজানে সবাই ধার্মিক হয়। কিন্তু বাকি এগারো মাস কতটুকু ধৈর্য রাখতে পারি?
রোজা রাখা আর জীবন যাপন – দুটোতেই সবর লাগে। পার্থক্য হলো, রোজার সবর সবাই দেখে। কিন্তু জীবনের সবর দেখে শুধু আল্লাহ।
আল্লাহর কাছে দোয়া করি, রমজানে যে ধৈর্য শিখি, সেটা যেন সারা বছর কাজে লাগাতে পারি। যেন জীবনের সব কষ্ট সহ্য করার শক্তি পাই।
কারণ আমি বুঝেছি, জীবনটাই একটা লম্বা রোজা। আর মৃত্যু হলো ইফতার।
একটু ভাবনা রেখে যান