পুরনো দরখাস্তের ফাইল উল্টাতে উল্টাতে দেখলাম আমার জীবনের সব রঙ মিলিয়ে গেছে। সব কিছু ধূসর হয়ে গেছে। কারণ আমি শুধু অপেক্ষা করি। অনুমোদনের অপেক্ষা। সেই অনুমোদন কখনো আসে না। আর অপেক্ষা করতে করতে আমার জীবনের সব রঙ ঝরে গেছে।
এই ফাইলে আছে আমার গত দশ বছরের সব দরখাস্ত। চাকরির জন্য, বাড়ির জন্য, আরাশের স্কুলের জন্য, হ্যাপির চিকিৎসার জন্য। সব দরখাস্তই “বিবেচনাধীন” বা “অনুমোদনের অপেক্ষায়।”
প্রথম দিকে আশা ছিল। মনে হতো যেকোনো দিন ফোন আসবে। “আপনার দরখাস্ত অনুমোদিত হয়েছে।” কিন্তু সেই ফোন কখনো আসেনি।
একটা একটা করে আশা মরে গেছে। একটা একটা করে স্বপ্ন ধূসর হয়েছে। একটা একটা করে জীবনের রঙ মিলিয়ে গেছে।
আমার বয়স যখন ২৯, তখন একটা ভালো চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। বলেছিল, “তিন মাসের মধ্যে জানাব।” এখন আমার বয়স ৩৯। এখনো সেই দরখাস্ত “বিবেচনাধীন।”
এই দশ বছরে আমি অন্য চাকরি করেছি। হারিয়েছি। আবার পেয়েছি। কিন্তু সেই প্রথম দরখাস্তের অপেক্ষা এখনো করি। যদিও জানি আর কোনো মানে নেই।
আরাশের জন্য একটা ভালো স্কুলে দরখাস্ত করেছিলাম। ওর বয়স তখন ৫। এখন ১১। এখনো সেই স্কুল থেকে কোনো উত্তর পাইনি। ওদের বলেছি, “তালিকায় আছেন। অপেক্ষা করুন।”
হ্যাপির অসুখের জন্য সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসার দরখাস্ত করেছিলাম। পাঁচ বছর হয়ে গেল। এখনো “যাচাইয়ের পর্যায়ে।”
আমার নিজের জন্য একটা ছোট লোনের দরখাস্ত করেছিলাম। ব্যাংক বলেছিল, “শীঘ্রই ফোন পাবেন।” দুই বছর হয়ে গেল। এখনো ফোনের অপেক্ষায়।
এই অপেক্ষার মধ্যে আমার জীবনের সব উৎসাহ শেষ। সব আনন্দ মরে গেছে। আমি একটা ধূসর মানুষ হয়ে গেছি।
আল্লাহর কাছে দোয়া করি, “হে আল্লাহ, তোমার অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হয় না তো?” কিন্তু মনে হয় আল্লাহর কাছেও হয়তো একটা অনুমোদন প্রক্রিয়া আছে।
হ্যাপি বলে, “তুমি এত বিষণ্ণ কেন?” আমি বলি, “অপেক্ষায় ক্লান্ত।” কিন্তু সে বুঝবে না অপেক্ষার যন্ত্রণা কী।
আরাশ বলে, “আব্বু, আপনি সবসময় কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করেন কেন?” আমি বলি, “অনুমোদন ছাড়া কিছুই হয় না।” কিন্তু ও বুঝবে না অনুমোদনের দাসত্ব কী।
এই অপেক্ষার মধ্যে আমার চুল পেকে গেছে। মুখে বলিরেখা পড়েছে। চোখে ক্লান্তি এসেছে। অপেক্ষা আমাকে বুড়ো করে দিয়েছে।
আমার স্বপ্নগুলোও অপেক্ষার মধ্যে মরে গেছে। একসময় ভেবেছিলাম নিজের একটা ব্যবসা করব। কিন্তু ব্যবসার অনুমোদনের জন্য দরখাস্ত করে অপেক্ষা করতে করতে সেই ইচ্ছা মরে গেছে।
একসময় ভেবেছিলাম একটা বই লিখব। কিন্তু প্রকাশকের অনুমোদনের অপেক্ষায় লেখার ইচ্ছা শেষ।
একসময় ভেবেছিলাম হ্যাপিকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাব। কিন্তু ছুটির অনুমোদনের অপেক্ষায় সেই ইচ্ছাও মরে গেছে।
আমার মনে হয় এই দেশে সবকিছুর জন্য অনুমোদন লাগে। এমনকি বেঁচে থাকার জন্যও।
রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি, আগামীকাল হয়তো কোনো অনুমোদন আসবে। কিন্তু জানি আসবে না। আরও অপেক্ষা। আরও ধূসর দিন।
আর এভাবে অপেক্ষায় অপেক্ষায় একদিন জীবন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু অনুমোদন আসবে না।
হয়তো মৃত্যুর জন্যও অনুমোদনের দরকার হবে। সেই অনুমোদনও আসবে না। তাই আমাকে অমর হয়ে অপেক্ষায় থেকে যেতে হবে।
একটু ভাবনা রেখে যান