কালকে সকালে আরাশ এসে বলল, “বাবা, আমার বন্ধুরা সবাই অনলাইন গেম খেলে। আমি কেন পারি না?”
আমি চা-কাপ হাতে বারান্দায় বসে ছিলাম। হ্যাপি পাশের ঘর থেকে শুনল। এসে দাঁড়াল।
“কারণ আমাদের বাড়িতে সেই ব্যবস্থা নেই,” আমি বললাম।
কিন্তু আরাশের চোখে যে হতাশা দেখলাম, সেটা আমার বুকে বিঁধল।
আমি কি আমার সন্তানকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে দিচ্ছি না? নাকি তাকে রক্ষা করছি?
আমাদের বাড়িতে টিভি নেই। আরাশের আইপ্যাড আছে কিন্তু হ্যাপির অনুমতি লাগে। হ্যাপি ফোন দেখতে চায় কিন্তু আমি মাঝে মাঝে ভাবি এটা কি ঠিক।
আমি কি একজন সচেতন বাবা নাকি পুরনো ভাবনার বন্দী?
এই প্রশ্নটা আমাকে রাতদিন তাড়া করে।
একদিকে দেখি আমার বন্ধু জামিউরের ছেলে সারাদিন ফোনে গেম খেলে। পড়াশোনায় মনোযোগ নেই। বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে না। আমার মনে হয় আমি ঠিক করছি আরাশকে এসব থেকে দূরে রেখে।
অন্যদিকে দেখি আরাশের বন্ধুরা নতুন নতুন অ্যাপ্লিকেশন, গেম, ইউটিউব ভিডিও নিয়ে কথা বলে। আরাশ সেই আলোচনায় অংশ নিতে পারে না। সে আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
তাহলে আমি কি তাকে social isolation-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছি?
হ্যাপি বলে, “ওকে একটু ছাড় দাও। সবার সাথে মিশে চলুক।”
আমি বলি, “কিন্তু এই ডিজিটাল জগতে ওর শৈশব হারিয়ে যাবে।”
হ্যাপি প্রশ্ন করে, “তাহলে ও কি আমাদের যুগে ফিরে যাবে? আমাদের সময়ের খেলাধুলা করবে?”
এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।
আমি লেখালেখি করি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই। আমার কাজই টেকনোলজি নির্ভর। তাহলে আমি কি ভণ্ডামি করছি? নিজে ব্যবহার করি কিন্তু সন্তানকে দূরে রাখি?
নাকি আমি ঠিকই করছি? কারণ আমি জানি টেকনোলজির ভালো-মন্দ। আমি controlled ব্যবহার করি। কিন্তু আরাশ তো এখনও সেই বোধ অর্জন করেনি।
গত সপ্তাহে আরাশ বারান্দায় বসে রাস্তার মানুষ দেখছিল। হঠাত প্রশ্ন করল, “বাবা, ওই রিক্সাওয়ালা আঙ্কেল কেন এত দ্রুত চালাচ্ছেন?”
আমি বুঝলাম আরাশের observation power কত তীক্ষ্ণ। এই যে মানুষের জীবন নিয়ে কৌতূহল, এই যে real world নিয়ে আগ্রহ – এসব কি ডিজিটাল স্ক্রিনে পাওয়া যায়?
কিন্তু আবার মনে হয় – আমি কি তাকে digital literacy থেকে বঞ্চিত করছি? ভবিষ্যতে সবকিছু digital হয়ে গেলে সে কি পিছিয়ে পড়বে?
আমার এক কলিগ বলেছিল, “বাচ্চাদের একদম বারণ করো না। বরং সীমা নির্ধারণ করে দাও। তাহলে তারা আরও বেশি আকৃষ্ট হবে।”
কিন্তু সেই সীমা কতটুকু? দিনে এক ঘন্টা? দুই ঘন্টা? কোন content দেখতে দেওয়া যাবে? কোনটা নয়?
আমি ভাবি – আমাদের ছোটবেলায় এত জটিলতা ছিল না। মাঠে খেলতাম, বই পড়তাম, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাম। কিন্তু সেই সময় তো আর ফিরে আসবে না।
হ্যাপি একদিন বলল, “তুমি কি আরাশকে তোমার মতো করে গড়তে চাও? নাকি ওর যুগের মানুষ বানাতে চাও?”
এই প্রশ্নটা আমাকে নাড়িয়ে দিল। আমি কি আরাশের ওপর আমার ছোটবেলার স্বপ্ন চাপিয়ে দিচ্ছি?
আমার মায়া-মায়া চেহারার পেছনে হয়তো একটা ভয় লুকিয়ে আছে। ভয় যে আমি যদি আরাশকে ডিজিটাল জগতে ছেড়ে দিই, তাহলে সে আমার থেকে দূরে চলে যাবে। আমাদের সেই সন্ধ্যার গল্পের সময়, বারান্দায় বসে মানুষ দেখার সময় – এসব হারিয়ে যাবে।
কিন্তু এটা কি আমার স্বার্থপরতা? আমি কি আমার comfort zone ধরে রাখার জন্য আরাশের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দিচ্ছি?
গতকাল রাতে আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি মনে কর বাবা তোমার সাথে অন্যায় করছে?”
সে একটু ভেবে বলল, “না বাবা। তবে মাঝে মাঝে লাগে আমি অন্যদের থেকে আলাদা।”
“আলাদা মানে?”
“মানে আমি অন্যদের মতো জিনিস জানি না। তারা যে games-এর কথা বলে, সেগুলো আমি জানি না।”
এই কথা শুনে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আমি কি আমার সন্তানকে তার বয়সীদের থেকে isolate করে ফেলেছি?
কিন্তু তারপরই আরাশ বলল, “তবে আমি অন্য অনেক কিছু জানি যেটা তারা জানে না। আমি জানি কোন পাখি কখন ডাকে। কোন ফুল কোন সময় ফোটে। রাস্তার মানুষদের মুখ দেখে বোঝা যায় তাদের মন কেমন।”
আমি বুঝলাম – হয়তো digital detox আর digital denial-এর মধ্যে পার্থক্য এখানেই। Detox মানে সচেতনভাবে alternative তৈরি করা। Denial মানে অন্ধভাবে প্রত্যাখ্যান।
আমি আরাশকে শুধু ডিজিটাল জগত থেকে দূরে রাখিনি। আমি তার জন্য অন্য একটা জগত তৈরি করেছি। বই, গল্প, প্রকৃতি, মানুষ।
তবে এটাও ঠিক যে আমি তাকে চিরকাল এই bubble-এ রাখতে পারব না। একদিন তাকে digital world-এ প্রবেশ করতে হবে।
তাহলে আমার কাজ কী? তাকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করা। Gradually introduce করা। একদম বন্ধ রাখা নয়, আবার একদম ছেড়ে দেওয়াও নয়।
আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছি – আরাশকে সপ্তাহে দুদিন এক ঘন্টা করে educational content দেখতে দেব। কিন্তু সেটাও আমার সাথে বসে। একা নয়।
যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা আর যুগের কাছে আত্মসমর্পণ – এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করাই বোধহয় আধুনিক বাবার চ্যালেঞ্জ।
একটু ভাবনা রেখে যান