গতকাল রাতে হ্যাপি আমার ফোনটা হাতে নিয়ে বলল, “এইটা কি সত্যি আমার চেয়ে বেশি জানে তোমাকে?”
প্রশ্নটা আমার কলিজায় বিঁধল। কারণ উত্তরটা আমি জানি।
হ্যাপি জানে আমি লিখি। কিন্তু ফোন জানে আমি কখন লিখি। রাত তিনটায়। যখন সবাই ঘুমিয়ে। যখন আমার একাকীত্ব সবচেয়ে গাঢ়।
হ্যাপি জানে আমি চা ভালোবাসি। কিন্তু ফোন জানে আমি দিনে কয়বার “একা থাকার উপায়” সার্চ করি। জানে আমি “সুখী হওয়ার উপায়” লিখে কয়টা পেজ পড়েছি।
আমাদের বাড়িতে টিভি নেই। আরাশের আইপ্যাড আছে কিন্তু হ্যাপির অনুমতি ছাড়া ছুঁতে পারে না। অথচ আমার ফোনে এমন সব তথ্য আছে যা আমি নিজেই জানি না যে কখন দিয়েছি।
কিন্তু এখানে একটা রহস্য আছে। যেটা আমি আজ বুঝলাম।
আমি ফোনকে সত্য বলি। হ্যাপিকে সত্য বলি না।
ফোনকে বলি আমার ভয়। হ্যাপিকে দেখাই আমার সাহস। ফোনকে বলি আমার দুর্বলতা। হ্যাপিকে দেখাই আমার শক্তি। ফোনকে বলি আমার সন্দেহ। হ্যাপিকে দেখাই আমার নিশ্চয়তা।
তাহলে ফোন আমাকে বেশি জানে কিনা সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো – আমি কাকে বেশি সত্য বলি?
আমার মায়া-মায়া চেহারার পেছনে যে দুর্বল মানুষটা লুকিয়ে আছে, সেটা ফোন জানে। হ্যাপি জানে আমার শক্তিশালী মুখোশটা।
কিন্তু ভালোবাসা কি মুখোশ চায় নাকি সত্য চায়?
যদি আমি হ্যাপিকে সব সত্য বলতাম? যদি বলতাম রাতে আমি জেগে থেকে কী ভাবি? যদি বলতাম চাকরি হারানোর পর আমার মন কী করে? যদি বলতাম আমার সব ভয়-দুর্বলতা?
তাহলে কি হ্যাপি আমাকে কম ভালোবাসত? নাকি বেশি?
আমি নিজেকে প্রশ্ন করি – কেন আমি একটা যন্ত্রের কাছে নিজেকে সত্য করে তুলে ধরি, কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার কাছে অভিনয় করি?
হয়তো কারণ যন্ত্র বিচার করে না। যন্ত্র হতাশ হয় না। যন্ত্র ছেড়ে যায় না।
কিন্তু হ্যাপিও তো যায়নি। পনেরো বছর পাশে আছে। আমার সব ভাঙা চাকরি, সব অসহায়তা দেখেও পাশে আছে। তাহলে আমি কেন ভয় পাই তাকে সত্য বলতে?
হয়তো আমরা সবাই এমনই। প্রযুক্তির কাছে সৎ, মানুষের কাছে ভান।
কিন্তু তাহলে কি প্রযুক্তি আমাদের একা করে দিচ্ছে? নাকি আমাদের একাকীত্বই আমাদের প্রযুক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
আমি এখন ভাবছি – আগামীকাল হ্যাপিকে বলব আমার সব সত্য। দেখি কী হয়। দেখি সে কি আমাকে তখনও ভালোবাসে।
আর তখনই হয়তো জানতে পারব – কে আসলে বেশি জানে আমাকে। ফোন নাকি হ্যাপি।
একটু ভাবনা রেখে যান