ব্লগ

অসহায়তার দীর্ঘতম রাত

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

রাত তিনটা। আরাশের জ্বর ১০৩ ডিগ্রি। আমি তার পাশে বসে আছি। মাথায় পানি দিচ্ছি। কিন্তু জ্বর কমছে না।

আমি অনুভব করছি এক গভীর অসহায়ত্ব। আমার সন্তান কষ্ট পাচ্ছে, আর আমি কিছুই করতে পারছি না।


দিনের বেলা আরাশ বলেছিল, “বাবা, আমার মাথা ব্যথা।” আমি ভেবেছিলাম খেলাধুলা করে ক্লান্ত হয়ে গেছে।

সন্ধ্যায় যখন তার জ্বর এল, আমি দোকান থেকে প্যারাসিটামল কিনে আনলাম।

কিন্তু রাতে জ্বর আরো বেড়ে গেল।

আমি ডাক্তারকে ফোন করেছি। উনি বলেছেন, “পানি দিয়ে মাথা মুছে দিন। সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তারপর চেম্বারে নিয়ে আসুন।”

কিন্তু সকাল এখনো অনেক দূর।

আরাশ কাঁপছে। মাঝে মাঝে অস্পষ্ট কথা বলছে। আমি ভয় পাচ্ছি।

আমি একজন বাবা। আমার কাজ আমার সন্তানকে রক্ষা করা। কিন্তু জ্বরের বিপরীতে আমি অসহায়।

হ্যাপি ঘুমাচ্ছে। আমি তাকে ডাকিনি। একজনের ঘুম না হলেও চলে।

আমি আরাশের হাত ধরে বসে আছি। তার হাত অগ্নিগরম। আমার হাত ঠান্ডা।

আমি চাইছি আমার ঠান্ডা তার মধ্যে যাক। তার গরম আমার মধ্যে আসুক। কিন্তু এটা সম্ভব নয়।

মাঝে মাঝে আরাশ চোখ খুলে আমার দিকে তাকায়। তার চোখে একটা প্রশ্ন: “বাবা, তুমি আমাকে সুস্থ করবে?”

আমি হাসি। বলি, “অবশ্যই।” কিন্তু ভিতরে আতঙ্ক।

আমি জানি না কীভাবে আরাশকে সুস্থ করব। আমি জানি না জ্বর কখন কমবে। আমি জানি না এই রাত কখন শেষ হবে।

আমি ফোনে ইন্টারনেট দেখি। জ্বরের চিকিৎসা নিয়ে পড়ি। কিন্তু সব তথ্যই জানা। পানি দিন, বিশ্রাম দিন, ওষুধ দিন।

কিন্তু এর বেশি আমি কিছু করতে পারি না।

আমি ভাবি, বাবা হওয়ার সবচেয়ে কঠিন দিক হলো এই অসহায়ত্ব। সন্তানের কষ্ট দেখা, কিন্তু সেই কষ্ট দূর করতে না পারা।

আমি আরাশের জ্বর আমার মধ্যে নিয়ে নিতে চাই। আমি চাই আমার অসুখ হোক, আরাশের না।

কিন্তু এটা সম্ভব নয়।

আমি আরাশের মাথায় হাত রাখি। তার মাথা অগ্নিপিণ্ডের মতো গরম। আমার হাত ঠান্ডা। আমি ভাবি, আমার ঠান্ডা স্পর্শ তার কোনো স্বস্তি দিতে পারছে কি?

আরাশ বিড়বিড় করে বলে, “পানি।”

আমি তাকে পানি খাওয়াই। একটু একটু। সে পান করে আবার শুয়ে পড়ে।

আমি ঘড়ি দেখি। রাত চারটা। এখনো তিন ঘণ্টা বাকি সকাল হতে।

আমি ভাবি, এই তিন ঘণ্টা কীভাবে কাটাব? কীভাবে আরাশকে স্বস্তি দেব?

আমি আরাশের জন্য গল্প বলি। ছোট ছোট গল্প। যেগুলো সে ছোটবেলায় পছন্দ করত।

আরাশ শোনে না। কিন্তু আমার গল্প বলায় আমার নিজের একটু স্বস্তি হয়।

আমি বুঝি, এই গল্প আরাশের জন্য নয়। আমার নিজের জন্য। আমার অসহায়ত্ব কমানোর জন্য।

রাত পাঁচটার সময় আরাশের জ্বর একটু কমে। ১০১ ডিগ্রি। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।

আরাশ একটু স্বাভাবিক হয়। বলে, “বাবা, তুমি সারারাত জেগে আছো?”

আমি বলি, “হ্যাঁ। তোমার পাশে থাকতে ইচ্ছে করে।”

আরাশ বলে, “আমি ভালো হয়ে যাব।”

আমি বলি, “অবশ্যই।”

কিন্তু আমি জানি, সন্তানের অসুখ শুধু সন্তানের কষ্ট নয়। এটা বাবা-মায়েরও কষ্ট। হয়তো বেশি কষ্ট।

কারণ সন্তান শুধু নিজের ব্যথা অনুভব করে। কিন্তু বাবা-মা সন্তানের ব্যথা আর নিজের অসহায়ত্ব—দুটোই অনুভব করে।

সকাল হলে আমি আরাশকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। ডাক্তার ওষুধ দেবে। আরাশ সুস্থ হয়ে যাবে।

কিন্তু এই রাতের অসহায়ত্ব আমি ভুলব না। এই রাত আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে বাবা হওয়া মানে শুধু সুখ নয়। বাবা হওয়া মানে ভালোবাসার সাথে সাথে অসহায়ত্বও।

এবং সেই অসহায়ত্ব নিয়েই আমাকে একজন ভালো বাবা হতে হবে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *