সকাল ছয়টা বাজে। ঘুম ভাঙে।
বাথরুমে ঢুকি। আয়নায় একটা মুখ। চোখের নিচে কালো দাগ। গালে বালিশের ছাপ। এই মানুষটা কে?
ব্রাশ তুলি। উপরে নিচে। বামে ডানে। পাঁচ হাজার দিন ধরে একই কাজ। হাত নিজে থেকেই চলে। মাথা খালি।
রান্নাঘর থেকে জলের শব্দ আসে।
হ্যাপি চুলায় কেটলি বসিয়েছে। জানালা দিয়ে আলো ঢুকছে। তার চুলে সোনালি রেখা। সে টের পায় না।
চিনি দেয়। এক চামচ। আধা চামচ। চা পাতা ছড়ায়। আঙুল দিয়ে গুনে গুনে। প্রতিদিন একই পরিমাণ।
আমি দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি।
“কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছ?” হ্যাপি জিজ্ঞেস করে।
“জানি না।”
সে হাসে। চা ঢালে। কাপটা আমার দিকে এগিয়ে দেয়।
গরম ভাপ মুখে লাগে। প্রথম চুমুক। জিভ পোড়ে। প্রতিদিন পোড়ে। প্রতিদিন ভুলে যাই।
আরাশ তৈরি হচ্ছে না।
“জুতো কোথায়?” সে চেঁচায়।
“বিছানার নিচে।”
“নেই তো।”
“গতকাল সেখানেই রেখেছিলে।”
সে দৌড়ে যায়। ফিরে আসে। হাতে জুতো।
“বিছানার নিচেই ছিল।”
আমি কিছু বলি না।
স্কুলে যাওয়ার পথে সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। রাস্তায় মানুষ হাঁটছে। সবাই একদিকে।
“সবাই কোথায় যায়?” আরাশ জিজ্ঞেস করে।
“কাজে।”
“প্রতিদিন?”
“হ্যাঁ।”
“ক্লান্ত লাগে না?”
আমি রিয়ারভিউ মিররে তাকাই। ট্রাফিক পিছনে জমছে।
“লাগে।”
আরাশ চুপ করে যায়। তারপর বলে, “কাল আবার আসব, তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“পরশুও?”
“হ্যাঁ।”
সে আর কিছু বলে না।
স্কুলের গেটে নামিয়ে দিই। সে ব্যাগ কাঁধে ছুটে যায়। একবারও পেছনে তাকায় না।
গাড়ি ঘোরাই।
অফিসে ঢুকি। লিফটে উঠি। সাত তলা। দরজা খুলে বের হই। ডান দিকে ঘুরি। তিন নম্বর কিউবিকল।
কম্পিউটার খুলি। পাসওয়ার্ড দিই। স্ক্রিন জ্বলে ওঠে।
পাশের ডেস্কে রাহাত। সেও কম্পিউটার খুলছে। পেছনে ফারহানা। সামনে জাহিদ। সবাই একসাথে। একই মুহূর্তে।
কেউ কথা বলে না।
কীবোর্ডে আঙুল চলে। ক্লিক ক্লিক ক্লিক। সারা ফ্লোরে এই শব্দ।
দুপুর একটা।
ক্যান্টিনে নামি। প্লেটে ভাত, মাছ, ডাল। লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের পালা অপেক্ষা করি।
টেবিলে বসি। চামচ তুলি। মুখে দিই।
ভাতের গন্ধ। মাছের ঝোল। জিভে লবণ। গলা দিয়ে নামে।
জানালার বাইরে রোদ। গাছের পাতা নড়ছে। একটা কাক বসে আছে ডালে।
আমি চিবাই। গিলি। আবার চামচ তুলি।
বিকেল পাঁচটায় বের হই।
রাস্তায় মানুষ। সকালে যারা একদিকে যাচ্ছিল, তারা এখন উলটো দিকে। আমিও তাদের একজন।
বাসে উঠি। জানালার ধারে বসি।
বাইরে শহর সরে যাচ্ছে। দোকান, মানুষ, গাড়ি। সব ঝাপসা।
পাশে একজন বৃদ্ধ। তার চোখ বন্ধ। মাথা জানালায় ঠেকানো। ঘুমাচ্ছে নাকি জেগে আছে, বোঝা যায় না।
বাড়ি ফিরি।
দরজা খুলতেই আরাশ ছুটে আসে। পায়ে জড়িয়ে ধরে।
“আজকে তাড়াতাড়ি এসেছ!”
“না, একই সময়।”
“মনে হল তাড়াতাড়ি।”
সে ছেড়ে দিয়ে ছুটে যায়। টিভির সামনে বসে।
রান্নাঘরে হ্যাপি। ধোঁয়া উঠছে। পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ।
“কেমন ছিল?” সে জিজ্ঞেস করে। পেছনে না তাকিয়ে।
“ছিল।”
“মানে?”
“মানে… ছিল।”
সে চামচ নাড়ায়। আমি দাঁড়িয়ে থাকি।
রাতের খাবার।
তিনজন টেবিলে। প্লেটে ভাত। বাটিতে তরকারি।
আরাশ খেতে খেতে বলে, “আজকে রিয়ান বলল ওর বাবা পাইলট।”
“ও।”
“তুমি কী?”
“আমি? অফিসে কাজ করি।”
“সেটা কী কাজ?”
আমি ভাবি। কী বলব?
“কম্পিউটারে কাজ।”
“কম্পিউটারে কী করো?”
“লিখি। পড়ি। মেইল পাঠাই।”
আরাশ চুপ করে। তারপর বলে, “বোরিং।”
হ্যাপি হাসে। আমিও।
আরাশের পড়া।
বই খোলা টেবিলে। সে পেন্সিল ঘোরাচ্ছে।
“এই অঙ্কটা করো।”
“পারছি না।”
“চেষ্টা করো।”
“করেছি। পারছি না।”
আমি দেখি। সহজ অঙ্ক। যোগ বিয়োগ।
“এখানে দেখো। প্রথমে এটা…”
সে শোনে না। জানালার দিকে তাকায়।
“কী দেখছ?”
“চাঁদ উঠেছে।”
আমিও তাকাই। সত্যিই। গোল চাঁদ। হলুদ।
“অঙ্ক করো।”
“তুমিও তো চাঁদ দেখছ।”
কী বলব বুঝি না।
একদিন জামিউরকে বলেছিলাম, “ভাই, প্রতিদিন একই কাজ। বিরক্ত লাগে না?”
সে সিগারেট ধরাচ্ছিল। ধোঁয়া ছাড়ল।
“না।”
“কেন?”
“একইরকম করাটাই তো শান্তি।”
আমি তার দিকে তাকালাম। সে দূরে কোথাও দেখছিল।
“বুঝলাম না,” বললাম।
“বুঝবে।”
সেদিন বুঝিনি। আজও জানি না বুঝেছি কিনা।
রাত এগারোটা।
আরাশ ঘুমিয়ে গেছে। হ্যাপিও।
বাথরুমে যাই। আবার ব্রাশ। উপরে নিচে। বামে ডানে।
আয়নায় সেই মুখ। সকালের চেয়ে ক্লান্ত। চোখে ঘুম।
কে এই মানুষ?
সকালে যে উঠেছিল, সে কি আমি? নাকি অন্য কেউ?
বিছানায় শুই। হ্যাপি পাশ ফেরে। ঘুমের মধ্যে।
ছাদের দিকে তাকাই। অন্ধকার।
কাল সকালে আবার উঠব। আবার ব্রাশ করব। আবার চা খাব। আবার আরাশকে স্কুলে দেব।
একই দিন। একই কাজ।
তাহলে আজকের দিনটা কোথায় গেল?
চোখ বন্ধ করি।
ঘুম আসে না।
জানালা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে। মেঝেতে একটা সাদা চারকোনা।
কাল সেটা একটু সরে যাবে।
সকাল ছয়টা।
ঘুম ভাঙে।
একটু ভাবনা রেখে যান