আজ দুপুরে অফিসে এক সহকর্মীকে দেখলাম ভিআর হেডসেট পরে বসে আছে। সে বলল, “ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে একটা বিচে বেড়াচ্ছি।” আমি জানালার বাইরে তাকালাম – ঢাকার ধুলা, গাড়ির হর্ন, মানুষের ভিড়। তার চোখে সমুদ্রের নীল, কানে ঢেউয়ের শব্দ।
কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন জাগল – সে কোনটায় আছে? ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে নাকি রিয়েল ভার্চুয়ালিটিতে?
বাড়ি ফিরে দেখি আরাশ তার ট্যাবে একটা গেম খেলছে। সেখানে সে একজন সুপারহিরো, পৃথিবী বাঁচাচ্ছে। “তুই কোথায় আছিস এখন?”
“বাবা, আমি এখানেই আছি। কিন্তু আমার মন অন্য জগতে।”
“কোনটা বেশি আসল? তোর এই ঘর নাকি গেমের সেই জগৎ?”
আরাশ একটু ভেবে বলল, “বাবা, দুটোই আসল। কিন্তু আলাদা রকমের আসল।”
আমার ভিতরে একটা অ্যাপ আপডেট হলো। নাম “বাস্তবতা মাল্টিপল ভার্সন”।
রাতে হ্যাপির সাথে কথা বলছিলাম। “তুই কি মনে করিস আমাদের আসল জীবন ভার্চুয়াল হয়ে যাচ্ছে?”
“কী মানে?”
“মানে, আমরা সারাদিন ফোনে কথা বলি। ফেসবুকে মানুষের সাথে যোগাযোগ করি। অনলাইনে কাজ করি। আমাদের আসল জীবন কি ডিজিটাল হয়ে গেছে?”
হ্যাপি হেসে বলল, “হায়দার, তুমি এখন আমার সাথে কথা বলছ। আমি তোমার সামনে বসে আছি। এটা কি ভার্চুয়াল?”
“না।”
“তাহলে?”
আমি বুঝলাম। ভার্চুয়াল আর রিয়েল – এই ভাগটাই হয়তো ভুল। হয়তো এগুলো আলাদা দুটো জগৎ না, একই জগতের দুটো মাত্রা।
পরদিন আরাশের সাথে পার্কে গেলাম। সে তার ট্যাবে কিছু একটা দেখছিল। “কী দেখছিস?”
“বাবা, এই পার্কটার গুগল ম্যাপ দেখছি। দেখো, এখানে একটা পুকুর ছিল ১০ বছর আগে।”
আমরা চারপাশে তাকালাম। পুকুরের কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু ট্যাবের স্ক্রিনে সেই পুকুর আছে।
“তাহলে সেই পুকুরটা কি আসল না নকল?”
“বাবা, পুকুরটা নেই কিন্তু তার স্মৃতি আছে। স্মৃতি কি ভার্চুয়াল?”
আমি থমকে গেলাম। স্মৃতি তো সত্যিই রিয়েল, কিন্তু সেটা তো শারীরিকভাবে নেই।
আমার বাবার কথা মনে পড়ল। তিনি কোনো ভিআর হেডসেট ছাড়াই অতীতে ভ্রমণ করতেন। চোখ বন্ধ করে বসে থাকতেন। বলতেন, “নিজের শৈশব দেখছি।” সেটা কি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ছিল না?
নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। আল্লাহর সাথে দোয়ায় কথা বলার সময় আমি কোথায় থাকি? এই দুনিয়ায় নাকি তাঁর কাছে? আমার শরীর মসজিদে, কিন্তু মন আরশের কাছে। এটা কোন রিয়েলিটি?
হয়তো বাস্তবতা অনেক স্তরের। শারীরিক বাস্তবতা, মানসিক বাস্তবতা, আধ্যাত্মিক বাস্তবতা। টেকনোলজি আমাদের নতুন একটা স্তর দিয়েছে – ডিজিটাল বাস্তবতা।
আরাশকে বললাম, “তুই যখন গেম খেলিস, আর আমি যখন স্বপ্ন দেখি – দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী?”
“বাবা, গেমে আমি কন্ট্রোল করতে পারি। স্বপ্নে পারি না।”
“আর কোনো পার্থক্য?”
“গেম শেয়ার করতে পারি। স্বপ্ন পারি না।”
আমি বুঝলাম। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি আমাদের স্বপ্ন শেয়ার করার সুযোগ দিয়েছে। আমাদের কল্পনা অন্যদের সাথে ভাগ করার উপায়।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যখন আমরা ভুলে যাই কোনটা কোনটা। যখন ভার্চুয়াল রিয়েলিটি আমাদের রিয়েল রিয়ালিটি থেকে পালিয়ে বেড়ানোর জায়গা হয়ে যায়।
হ্যাপিকে বললাম, “আমাদের কি ভয় পাওয়া উচিত ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নিয়ে?”
“না। ভয় পাওয়া উচিত নিজেদের নিয়ে। আমরা কি জানি কোনটা গুরুত্বপূর্ণ?”
“মানে?”
“মানে, ভার্চুয়াল সমুদ্রে ঘুরে এসে যদি আসল সমুদ্র দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি, তাহলে সমস্যা।”
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলাম। এই যে আমি দেখছি, এটা কি আসল আমি? নাকি আলোর প্রতিফলন?
বুঝলাম, আয়না একটা প্রাচীন ভার্চুয়াল রিয়েলিটি। আমাদের প্রতিবিম্ব দেখায়। কিন্তু আমরা জানি সেটা আমি নই, আমার ইমেজ।
ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সমস্যা না। সমস্যা যখন আমরা আয়নার প্রতিবিম্বকে নিজেদের চেয়ে বেশি পছন্দ করতে শুরু করি।
আসল প্রশ্ন ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নাকি রিয়েল ভার্চুয়ালিটি সেটা নয়। প্রশ্ন হলো: আমরা কি জানি আমরা কোন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি?
একটু ভাবনা রেখে যান