ব্লগ

দুই যুগের বন্ধুত্ব

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আরাশের বন্ধুরা এসেছে বাড়িতে। তিনজন ছেলে। সবার হাতে মোবাইল ফোন। তারা একসাথে বসে আছে, কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। সবাই নিজ নিজ পর্দায় মগ্ন।

আমি দেখি আর ভাবি, আমাদের শৈশবের বন্ধুত্ব কতটা আলাদা ছিল।


আমার শৈশবে বন্ধুত্ব মানে ছিল একসাথে মাঠে খেলা। গাছে চড়া। পুকুরে সাঁতার কাটা। লুকোচুরি খেলা।

আমরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একসাথে থাকতাম। কথা বলতাম। হাসতাম। ঝগড়া করতাম। আবার মিলে যেতাম।

আমাদের বন্ধুত্বে কোনো যন্ত্রের মধ্যস্থতা ছিল না। আমরা সরাসরি একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতাম।

আরাশের বন্ধুত্ব ভিন্ন। তারা একই জায়গায় বসে থেকেও আলাদা আলাদা পৃথিবীতে বাস করে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তোমরা কী করছ?”

একজন বলল, “আমরা একসাথে খেলছি।”

কিন্তু আমি দেখলাম, তারা প্রত্যেকে আলাদা খেলা খেলছে। তাদের “একসাথে” এর অর্থ ভিন্ন।

আমাদের সময়ে বন্ধুত্ব শুরু হতো পাশাপাশি বসা থেকে। একসাথে টিফিন খাওয়া থেকে। একসাথে বাড়ি ফেরা থেকে।

আরাশের বন্ধুত্ব শুরু হয় যোগাযোগ নম্বর আদান-প্রদান থেকে। একে অপরকে বার্তা পাঠানো থেকে।

আমাদের বন্ধুত্বে রহস্য ছিল। আমরা গোপন কথা বলতাম। চুপিচুপি পরিকল্পনা করতাম।

আরাশের বন্ধুত্বে সব কিছু খোলা। তাদের সব কথা সবাই জানে। কারণ সব কিছু ইন্টারনেটে শেয়ার হয়।

আমাদের সময়ে বন্ধুর বাড়িতে যেতে হতো তাকে দেখার জন্য। আরাশের সময়ে বন্ধুর অবস্থা জানতে পর্দার দিকে তাকানোই যথেষ্ট।

আমাদের বন্ধুত্বে শারীরিক উপস্থিতি জরুরি ছিল। আরাশের বন্ধুত্বে শারীরিক উপস্থিতি ঐচ্ছিক।

আমি দেখি, আরাশের বন্ধুরা কম কথা বলে। তারা ইশারায় কথা বলে। পর্দার দিকে তাকিয়ে হাসে।

আমাদের বন্ধুত্বে অনেক কথা ছিল। আমরা সব কিছু নিয়ে কথা বলতাম। স্বপ্ন নিয়ে। ভবিষ্যৎ নিয়ে। ভয় নিয়ে।

আরাশের বন্ধুত্বে কথার চেয়ে ছবি বেশি। তারা ছবি দেখে। ছবি শেয়ার করে। ছবি নিয়ে আলোচনা করে।

আমাদের সময়ে বন্ধুত্বের জন্য সময় দিতে হতো। আরাশের সময়ে বন্ধুত্বের জন্য ইন্টারনেট লাগে।

আমি লক্ষ করি, আরাশের বন্ধুরা বেশি জানে। তাদের তথ্যের ভাণ্ডার বিশাল। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সীমিত।

আমাদের তথ্য কম ছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতা বেশি ছিল। আমরা নিজের চোখে দেখতাম। নিজের হাতে ছুঁয়ে দেখতাম।

আরাশের বন্ধুরা পর্দায় দেখে। পর্দার মাধ্যমে অনুভব করে।

আমাদের বন্ধুত্বে ঝগড়া হতো। মারামারি হতো। কিন্তু পরদিন আবার মিলে যেতাম।

আরাশের বন্ধুত্বে ঝগড়া হলে একে অপরকে ব্লক করে দেয়। যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

আমাদের বন্ধুত্বে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ ছিল। আরাশের বন্ধুত্বে ক্ষমা চাওয়া কঠিন।

কিন্তু আমি এটাও দেখি যে, আরাশের বন্ধুত্বে বৈচিত্র্য আছে। তার বন্ধুরা ভিন্ন ভিন্ন জায়গার। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির।

আমাদের বন্ধুত্ব ছিল একই এলাকার। একই পরিবেশের।

আরাশের বন্ধুত্বে সীমানা নেই। সে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করতে পারে।

আমাদের বন্ধুত্ব সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গভীর ছিল।

আমি ভাবি, কোন বন্ধুত্ব ভালো? আমাদের নাকি আরাশের?

আমি ঠিক উত্তর খুঁজে পাই না। কারণ দুই যুগের বন্ধুত্বের দুটি আলাদা সৌন্দর্য আছে।

আমাদের বন্ধুত্বে ছিল গভীরতা। আরাশের বন্ধুত্বে আছে ব্যাপকতা।

আমাদের বন্ধুত্ব ছিল স্থায়ী। আরাশের বন্ধুত্ব তাৎক্ষণিক।

আমি চাই আরাশ দুটোর সমন্বয় করুক। যন্ত্রের সুবিধা নিক, কিন্তু মানুষের স্পর্শ হারিয়ে না ফেলুক।

কারণ শেষ পর্যন্ত, বন্ধুত্বের মূল্য যন্ত্রে নয়। মানুষের হৃদয়ে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *