আরাশ স্কুল থেকে ফিরে বলল, “বাবা, টিচার বলেছে ডারউইনের থিওরি অনুযায়ী মানুষ বানর থেকে এসেছে। কিন্তু আপনি তো বলেছেন আদম (আ.) থেকে এসেছে। কোনটা সত্যি?”
এখানেই শুরু। এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব।
কী উত্তর দেব? বলব – “বিজ্ঞান মিথ্যা, ধর্ম সত্য?” তাহলে আরাশ যে আধুনিক পৃথিবীতে বাঁচতে হবে, সেখানে সে পিছিয়ে থাকবে।
বলব – “বিজ্ঞান সত্য, ধর্ম গল্প?” তাহলে তার ঈমান চলে যাবে। আর ঈমান ছাড়া জীবনের অর্থই বা কী?
নাকি বলব – “দুটোই সত্য?” কিন্তু দুটো পরস্পর বিরোধী বিষয় কীভাবে একসাথে সত্য হতে পারে?
দেখি, আমার নিজের মধ্যেই এই দ্বন্দ্ব। একদিকে আমি জানি – আধুনিক চিকিৎসা, টেকনোলজি, বিজ্ঞান ছাড়া বাঁচা যায় না। অন্যদিকে জানি – আল্লাহ, রাসূল (সা.), কুরআন ছাড়াও বাঁচা যায় না।
অফিসে গেলে আমি এক মানুষ। সেখানে আমি ব্যবহার করি যুক্তি, তথ্য, প্রমাণ। বলি – “Data দেখাও, Evidence দাও।” মসজিদে গেলে আমি আরেক মানুষ। সেখানে আমি ব্যবহার করি ঈমান, বিশ্বাস, আনুগত্য। বলি – “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা বলেছেন।”
এই দুই মানুষের মধ্যে সমন্বয় কোথায়?
সমস্যা হচ্ছে – আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা এখনো মধ্যযুগীয়। সেখানে বলা হয় – “প্রশ্ন করো না, মেনে নাও।” আর আধুনিক শিক্ষা বলে – “সবকিছু প্রশ্ন করো, প্রমাণ ছাড়া কিছু মানো না।”
তাহলে আমি কোন পথে চলব? আরাশকে কী শেখাব?
আমি চেষ্টা করি একটা মাঝামাঝি পথ খুঁজে নিতে। বলি – “দেখ আরাশ, বিজ্ঞান বলে কীভাবে হয়েছে। ধর্ম বলে কেন হয়েছে।”
কিন্তু এটা কি সন্তোষজনক উত্তর? নাকি আমি শুধু সমস্যাটা এড়িয়ে যাচ্ছি?
মাঝে মাঝে মনে হয় – হয়তো আমি দুটো জগতেই অর্ধেক মানুষ। না পুরোপুরি ধার্মিক, না পুরোপুরি আধুনিক। একটা অসম্পূর্ণ সংমিশ্রণ।
কিন্তু তারপরই মনে হয় – হয়তো এটাই এই যুগের চ্যালেঞ্জ। হয়তো আমাদের তৈরি করতে হবে নতুন একটা পথ। যেখানে বিজ্ঞান আর ধর্ম দুশমন নয়, সহযোগী।
যেখানে আল্লাহর সৃষ্টি অধ্যয়ন করাটাও ইবাদত। যেখানে বিজ্ঞানের আবিষ্কার আল্লাহর কুদরতের প্রমাণ।
কিন্তু সেই পথ খুঁজে পেতে কত সময় লাগবে? আর ততক্ষণ আরাশের মতো বাচ্চারা কী করবে?
এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই বেড়ে উঠবে তারা। আমার মতোই অসম্পূর্ণ হয়ে।
একটু ভাবনা রেখে যান