ব্লগ

দুই পথের সন্ধিক্ষণ

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

শিক্ষা বনাম তাৎক্ষণিক কর্মজীবনের প্রশ্নটি মূলত ‘হয়ে ওঠা’ বনাম ‘থাকা’র অস্তিত্ববাদী দ্বন্দ্ব। এখানে সংঘাত হচ্ছে দুই ধরনের সময়চেতনার – একটি রৈখিক ও তাৎক্ষণিক, অন্যটি চক্রাকার ও দীর্ঘমেয়াদি।

শিক্ষার দর্শনে লুকিয়ে আছে ‘বিলম্বিত তৃপ্তির অধিবিদ্যা’। এটি এমন একটি বিশ্বাস যে, বর্তমানের ত্যাগ ভবিষ্যতের পূর্ণতা নিয়ে আসবে। কিন্তু এই বিশ্বাসের ভিত্তি কী? এটি কি একটি যুক্তিসঙ্গত গণনা, নাকি সমাজের আরোপিত একটি মূল্যব্যবস্থা?

অন্যদিকে, তাৎক্ষণিক কর্মজীবনের মধ্যে আছে ‘বর্তমানতার নৈতিকতা’। এই দৃষ্টিভঙ্গি বলে যে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য নিশ্চিত বর্তমানকে বলিদান দেওয়া অযৌক্তিক। এখানে সময় একটি সম্পদ, যা ব্যয় করলে ফিরে আসে না।

কিন্তু এই দুই অবস্থানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ‘মূল্য ও মূল্যের দ্বন্দ্ব’। শিক্ষা কি একটি ভোগ্যপণ্য, নাকি একটি আত্মিক প্রক্রিয়া? যখন আমরা শিক্ষাকে ভবিষ্যত আয়ের হাতিয়ার হিসেবে দেখি, তখন আমরা এর অন্তর্নিহিত মূল্যকে হত্যা করি। আবার যখন আমরা এর বস্তুগত প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করি, তখন আমরা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি।

এই প্রসঙ্গে ‘প্রয়োজনের স্তরবিন্যাস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শারীরিক প্রয়োজন, নিরাপত্তার প্রয়োজন, সামাজিক স্বীকৃতির প্রয়োজন, আত্মিক পূর্ণতার প্রয়োজন – এই স্তরগুলো কি একটি নির্দিষ্ট ক্রমে পূরণ হতে হবে? নাকি সমান্তরালভাবে সংগ্রাম করা সম্ভব?

‘জ্ঞানের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ এখানে আরেকটি মাত্রা যোগ করে। কে পড়ার সুযোগ পায়, কার জন্য শিক্ষা একটি বিলাসিতা – এই বিভাজন সমাজের ক্ষমতাকাঠামোকে চিরায়ত করে তোলে। গরিব পরিবারের সন্তানের জন্য ‘বিলম্বিত তৃপ্তি’ একটি অসম্ভব দর্শন, কারণ তার বর্তমানই অনিশ্চিত।

কিন্তু এই অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদের মধ্যেই জন্ম নেয় আরেকটি প্রশ্ন – ‘প্রকৃত শিক্ষার সংজ্ঞা’। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রের শিক্ষা, জীবনের শিক্ষা – এগুলোর মধ্যে কোনটি বেশি মূল্যবান? নাকি এই বিভাজনই কৃত্রিম?

এখানে ‘অভিজ্ঞতার জ্ঞানতত্ত্ব’ একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। প্রতিটি কাজ একটি জ্ঞান, প্রতিটি ব্যর্থতা একটি শিক্ষা। তাহলে কাজ ও শিক্ষার মধ্যে বিরোধ কেন? এই বিরোধ কি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির ফল?

‘পরিচয় গঠনের সময়কাল’ আরেকটি জটিল বিষয়। আমাদের ব্যক্তিত্ব কখন গঠিত হয়? তরুণ বয়সে নেওয়া সিদ্ধান্ত কি আমাদের সারাজীবনের জন্য সংজ্ঞায়িত করে দেয়? নাকি আমরা প্রতিটি মুহূর্তে নিজেদের পুনর্নির্মাণ করতে পারি?

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, শিক্ষা বনাম কর্মজীবনের প্রশ্নটি আসলে একটি মিথ্যা দ্বিধাবিভাগ। প্রকৃত প্রশ্ন হচ্ছে – আমি কীভাবে একটি অর্থপূর্ণ জীবন গড়ব?

‘অর্থপূর্ণতার মাপকাঠি’ এখানে মৌলিক প্রশ্ন। অর্থ কি বাইরে থেকে আরোপিত, নাকি ভিতর থেকে সৃষ্ট? সমাজ বলে অর্থ মানে প্রতিষ্ঠা, সম্পদ, স্বীকৃতি। কিন্তু ব্যক্তি হয়তো অর্থ খুঁজে পায় সৃষ্টিতে, সেবায়, সম্পর্কে।

এই দুই ধারণার মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। কিন্তু এই সংঘাতের সমাধান বহির্মুখী নয়, অন্তর্মুখী। সমাধান লুকিয়ে আছে ‘সংশ্লেষের দিকতত্ত্বে’।

‘দ্বন্দ্বাত্মক চিন্তাভাবনা’ আমাদের শেখায় যে, থিসিস ও অ্যান্টিথিসিসের সংঘর্ষ থেকে জন্ম নেয় সিন্থেসিস। শিক্ষা ও কাজের বিরোধ থেকে জন্ম নিতে পারে এমন একটি জীবনপদ্ধতি, যেখানে দুটোই সমন্বিত।

এই সমন্বয় সম্ভব যখন আমরা ‘প্রক্রিয়া হিসেবে জীবন’কে দেখি। জীবন কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি যাত্রা। এই যাত্রায় কখনো শিক্ষার প্রয়োজন হবে, কখনো কাজের। কিন্তু দুটোই একই উদ্দেশ্যে – নিজেকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য।

তবে এই দর্শনের বাস্তবায়নে আছে ‘সুবিধার রাজনীতি’। যার আর্থিক স্বাধীনতা আছে, সে সহজেই এই সমন্বয়ের কথা বলতে পারে। কিন্তু যার বর্তমান অনিশ্চিত, তার জন্য এই দর্শন একটি বিলাসিতা মাত্র।

এই বাস্তবতা স্বীকার করেই বলতে হয় – প্রকৃত মানবিক সমাজ সেটিই, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের পূর্ণতার পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা পায়। আর সেই স্বাধীনতার পূর্বশর্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *