
আমরা তিনজন টেবিলে বসে খাচ্ছি। আমি, হ্যাপি, আরাশ।
কিন্তু খাওয়াটা অদ্ভুত লাগছে।
হ্যাপির হাত দেখছি। হাতটা খাবার তুলছে। মুখে দিচ্ছে। আবার নামছে। যান্ত্রিক। যেন হাতটা হ্যাপির নয়।
আরাশ হঠাৎ বলল, “শিক্ষক বলেছে মানুষ কথা বলে যোগাযোগের জন্য। কিন্তু আমরা তো কথা বলি না।”
কেউ উত্তর দিল না।
আমি চামচ তুলছি। নামাচ্ছি। তুলছি। নামাচ্ছি।
হ্যাপি বলল, “আজ বাজারে গিয়েছিলাম। দোকানদার আমাকে চিনতে পারেনি।”
“কোন দোকানে?”
“যেখানে দশ বছর ধরে যাই। সেই দোকানে।”
আমি তাকালাম। হ্যাপির মুখ আছে। কিন্তু মুখের ভেতর কিছু নেই। অন্তত আমার তাই মনে হল।
“সে বলল আপনাকে তো দেখি না। আমি বললাম আমি তো রোজ আসি। সে মাথা নাড়ল। না, দেখি না।”
আরাশ বলল, “হয়তো তুমি যাও না। হয়তো তুমি ভাবো যাচ্ছো।”
হ্যাপি চুপ করে রইল।
আমি খেতে থাকলাম। খাবারের কোনো স্বাদ নেই। কিন্তু চিবোচ্ছি। গিলছি।
আরাশ বলল, “আমার বন্ধু তানভীর বলেছিল তার বাবা-মা তার সাথে কথা বলে। প্রতিদিন। আমি বলেছিলাম তুমি মিথ্যা বলছ।”
“কেন মিথ্যা?”
“বাবা-মা কথা বলে না। এটা তাদের কাজ না।”
আমি কিছু বললাম না। কারণ আরাশ হয়তো ঠিক বলছে।
“তানভীর রেগে গিয়েছিল। বলেছিল আমি বুঝি না। তারপর আমরা আর কথা বলিনি।”
“তুমি কি তানভীরকে মিস করো?”
আরাশ আমার দিকে তাকাল। “মিস মানে কী?”
আমি বুঝলাম সে জানে না মিস মানে কী। কারণ কাউকে মিস করতে হলে প্রথমে কাছে পেতে হয়।
হ্যাপি হঠাৎ বলল, “আমি কি আছি?”
আমি তাকালাম।
“আমি জিজ্ঞেস করছি আমি কি আছি? তুমি কি আমাকে দেখতে পাও?”
“দেখতে পাচ্ছি।”
“দেখা আর থাকা কি একই?”
আমি কিছু বললাম না। কারণ জানি না।
হ্যাপি বলল, “আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তুমি আছো না।”
আমি চামচ তুলছি। নামাচ্ছি। হয়তো হ্যাপি ঠিক বলছে। আমি হয়তো নেই। শুধু দেখা যাচ্ছি।
আরাশ বলল, “শিক্ষক আরো বলেছিল একটা কথা।”
আমরা দুজন তাকালাম।
“বলেছিল মানুষ মরে দুইবার। একবার যখন শরীর বন্ধ হয়। আরেকবার যখন কেউ মনে রাখে না।”
কেউ কিছু বলল না।
“আমি ভাবছিলাম আমরা হয়তো উল্টো। আমরা হয়তো প্রথমে মনে রাখা বন্ধ করে দিয়েছি।”
খাওয়া চলছে। যান্ত্রিক খাওয়া।
আমার হঠাৎ মনে পড়ল বাবার কথা। মারা যাওয়ার আগের দিন একটা অদ্ভুত কথা বলেছিল।
“আমি কি তোমার বাবা ছিলাম? নাকি শুধু একই বাড়িতে থাকতাম?”
আমি তখন উত্তর দিইনি। কারণ জানতাম না উত্তর। এখনো জানি না।
হ্যাপি বলল, “আমার মা মারা যাওয়ার আগে বলেছিল মানুষ আসলে একটা দূরত্ব। শুরু আর শেষের মাঝে।”
আরাশ জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আমরা কি শুধু দূরত্ব?”
হ্যাপি বলল, “হয়তো।”
আমি দেখলাম টেবিলটা লম্বা হয়ে যাচ্ছে। না, টেবিল লম্বা হচ্ছে না। হয়তো আমার চোখের সমস্যা।
আরাশ ওপাশে বসে আছে। কিন্তু মনে হচ্ছে অনেক দূরে। হ্যাপি আরো দূরে।
আমি মুখ খুলতে চাইলাম। কিন্তু কণ্ঠস্বর বের হল না।
হ্যাপি বলল, “তুমি কি ভালোবাসো আমাদের?”
আমি বলতে চাইলাম হ্যাঁ। কিন্তু কথা আটকে রইল। শুধু একটা শব্দ হল। কোনো অর্থ নেই।
আরাশ বলল, “বাবা উত্তর দিচ্ছে না মানে জানে না। বাবা সবসময় চুপ থাকে মানে কিছুই জানে না।”
আমরা তিনজন বসে আছি। কিন্তু টেবিল এখন অনেক বড়। একটা দীর্ঘ টেবিল। প্রান্ত দেখা যাচ্ছে না।
আমি উঠতে চাইলাম। কিন্তু পা নড়ল না। পা মেঝের সাথে আটকে গেছে। নাকি মেঝে নেই? হয়তো শুরু থেকেই ছিল না।
হ্যাপি বলল, “আমি একদিন ভেবেছিলাম আমরা বদলাতে পারব। তারপর বুঝেছি মানুষ বদলায় না। মানুষ শুধু দূরে যায়।”
আরাশ বলল, “তাহলে আমরা কি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছি?”
হ্যাপি বলল, “হয়তো আমরা শুরু থেকেই অদৃশ্য ছিলাম।”
আমি আমার হাত দেখলাম। হাতটা আছে। কিন্তু অদ্ভুত লাগছে। যেন হাতটা আমার নয়। কারো আর।
আমার মনে পড়ল একদিন আরাশ জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, আমরা কি সত্যিই আছি?”
আমি হেসে বলেছিলাম, “অদ্ভুত প্রশ্ন করো না।”
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে প্রশ্নটা অদ্ভুত না। প্রশ্নটা সঠিক।
হ্যাপির কণ্ঠস্বর শুনলাম। খুব দূর থেকে। “তুমি কি আছো?”
আমি উত্তর দিতে চাইলাম। কিন্তু জানি না আমি আছি কি না।
আরাশের কণ্ঠস্বর এল। আরো দূর থেকে। “হয়তো আমরা কখনো ছিলাম না।”
তারপর নীরবতা।
আমি চোখ বন্ধ করলাম। খুললাম। তফাৎ নেই।
টেবিল এখনো আছে। খাবার এখনো আছে। হ্যাপি আরাশ এখনো বসে আছে।
কিন্তু সব দূরে। অনেক দূরে।
আমি চামচ তুলছি। নামাচ্ছি। তুলছি। নামাচ্ছি।
হয়তো এটাই আমার কাজ। চামচ তোলা। নামানো।
আর কিছু না।
একটু ভাবনা রেখে যান