আরাশের জন্মের পর আমি প্রথমবার বুঝলাম, আমার বাবা কেন আমার সাথে এত কম কথা বলতেন।
ভালোবাসা সবসময় শব্দে প্রকাশ পায় না। কখনো কখনো ভালোবাসা থাকে নীরবতায়, দূরত্বে, কঠোর শাসনে।
আমার বাবা মারা গেছেন যখন আমার তেইশ বছর বয়স। সেই তেইশ বছরে আমি তাকে কখনো “ভালোবাসি” বলতে শুনিনি। উনিও আমাকে কখনো বলেননি। আমি ভাবতাম, হয়তো বাবা আমাকে ভালোবাসেন না।
কিন্তু আরাশের বাবা হওয়ার পর আমি বুঝেছি, ভালোবাসার ভাষা পিতৃত্বে আলাদা। বাবারা ভালোবাসেন দায়িত্ব নিয়ে, ভবিষ্যতের জন্য চিন্তা করে, নিজেকে উজাড় করে দিয়ে।
আমার বাবা আমাকে কখনো জড়িয়ে ধরেননি। কিন্তু আমার জ্বর হলে সারারাত জেগে থাকতেন। আমার স্কুলের ফি দিতে গিয়ে নিজের খাওয়া বন্ধ করে দিতেন।
আমি তখন বুঝতাম না। ভাবতাম বাবা আবেগহীন, কঠিন। এখন বুঝি, বাবারা তাদের আবেগ লুকিয়ে রাখেন কারণ তারা মনে করেন পরিবারের জন্য শক্ত থাকতে হবে।
আরাশকে নিয়ে রাতে ঘুমাতে পারি না। ওর ভবিষ্যতের চিন্তায় অস্থির হয়ে যাই। আমার বাবাও কি এমনি করে আমাকে নিয়ে ভাবতেন? আমার ভবিষ্যতের জন্য কি এভাবেই চিন্তিত হতেন?
আমি মনে করার চেষ্টা করি বাবার মুখের কথা। কিন্তু মনে পড়ে না। মনে পড়ে শুধু ওনার নীরবতা। সেই নীরবতায় কত কথা লুকানো ছিল, আমি জানতাম না।
বাবারা কথা কম বলেন কারণ তাদের মুখে অনেক বেশি দায়িত্বের ভার। আমরা মায়ের কাছে আবদার করি, বাবার কাছে নিরাপত্তা খুঁজি। মা দেন আদর, বাবা দেন আশ্রয়।
আরাশ যখন আমার কাছে কিছু চায়, আমি প্রথমে ভাবি এটা ওর জন্য ভালো কিনা। তারপর দিই বা দিই না। এই হিসাব-নিকাশ আমার বাবাও করতেন। আমি তখন বুঝতাম না কেন বাবা সবকিছুতে ‘না’ বলেন।
এখন বুঝি, ‘না’ বলা কত কঠিন। সন্তানের কাঁদানি মুখ দেখে ‘না’ বলতে কত কষ্ট হয়। কিন্তু ‘না’ বলতে হয় সন্তানের ভালোর জন্য।
আমার বাবা আমাকে কখনো প্রশংসা করতেন না। আমি ভাবতাম উনি আমার সাফল্যে খুশি নন। এখন বুঝি, বাবারা প্রশংসা করেন না কারণ তারা চান সন্তান যেন অহংকারী না হয়। তারা চান সন্তান যেন আরো এগিয়ে যায়।
আরাশ যখন ভালো ফলাফল করে, আমিও ওকে বেশি প্রশংসা করি না। বলি, “আরো ভালো করতে পারবে।” এই কথাগুলো আমার বাবার কথার মতো লাগে।
আমি বুঝতে পারি, পিতৃত্ব একটা চক্র। আমার বাবা যেভাবে আমাকে ভালোবেসেছেন, আমিও সেভাবে আরাশকে ভালোবাসি। দূরত্ব রেখে, কঠিন হয়ে, দায়িত্ব নিয়ে।
কিন্তু আমি চেষ্টা করি আরাশের সাথে বেশি কথা বলতে। আমার বাবা যা পারেননি, আমি সেটা করার চেষ্টা করি। আমি আরাশকে বলি যে আমি ওকে ভালোবাসি।
তবুও মাঝে মাঝে লক্ষ করি, আমিও আমার বাবার মতো হয়ে যাচ্ছি। কম কথা বলছি, বেশি দায়িত্ব নিচ্ছি। হয়তো এটাই পিতৃত্বের স্বভাব।
একদিন আরাশ বড় হবে। হয়তো সেও ভাববে আমি ওকে ভালোবাসি না। কিন্তু যখন ও বাবা হবে, তখন বুঝবে আমার ভালোবাসার ভাষা।
আমার বাবার কবরে গিয়ে বলি, “বাবা, এখন বুঝেছি তুমি আমাকে কত ভালোবাসতে।” কিন্তু এই বোঝা এত দেরিতে এল কেন?
হয়তো এটাই নিয়ম। সন্তান তার বাবার ভালোবাসা বোঝে যখন সে নিজে বাবা হয়। আর ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়।
আমি চাই আরাশ যেন আমার ভালোবাসা বুঝতে এত দেরি না করে। তাই আমি ওকে বলি, ওকে জড়িয়ে ধরি, ওর সাথে খেলি।
কিন্তু জানি, কিছু জিনিস সময়ের সাথে সাথেই বোঝা যায়। পিতৃত্বের গভীরতা তার মধ্যে একটি।
একটু ভাবনা রেখে যান