
মাটি কাঁপলো মাত্র ছাব্বিশ সেকেন্ড। কিন্তু সেই ছাব্বিশ সেকেন্ডে আমরা বুঝলাম – আমরা যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা আসলে দাঁড়িয়ে নেই। ভূমিকম্পের পর প্রথম যে প্রশ্নটা মাথায় এলো, সেটা ছিল না “কতজন মারা গেছে” বা “কতটা ক্ষতি হয়েছে।” প্রশ্নটা ছিল অদ্ভুত – “আমি কি আসলে এখানে দাঁড়িয়ে আছি?”
যখন মাটি কাঁপে, শুধু মাটি কাঁপে না। কাঁপে আমাদের বিশ্বাস। আমরা সারাজীবন ধরে যে জিনিসটাকে সবচেয়ে স্থির, সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে এসেছি – মাটি – সেটাই যখন অস্থির হয়ে ওঠে, তখন আর কোথায় দাঁড়াবো? আমরা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠি একটা অলিখিত চুক্তি নিয়ে। চুক্তিটা হলো – আজকের দিনটা গতকালের মতোই হবে। সূর্য উঠবে, মাটি শক্ত থাকবে, বাতাস বইবে, পৃথিবী ঘুরবে। কিন্তু ভূমিকম্প এই চুক্তিটা ভেঙে দেয়। হঠাৎ করে। কোনো সতর্কতা ছাড়াই।
আমার এক বন্ধু বলেছিল, “ভূমিকম্পের সময় মনে হয়েছিল জীবনে প্রথমবার বুঝলাম – আমি আসলে কিছুই নিয়ন্ত্রণ করি না।” এটাই তো সত্য। আমরা ভাবি আমরা আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করি। চাকরি করব, বাড়ি বানাব, পরিবার গড়ব, স্বপ্ন দেখব। কিন্তু মাটি যখন কাঁপে, তখন বোঝা যায় – আমরা শুধু অতিথি। এই পৃথিবীতে স্থায়ী কিছু নেই। মাটিও না।
ভূমিকম্পের পর মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করেনি তারা কেন কাঁদছে। মৃত্যুর ভয়ে? না। মৃত্যু তো সামনে নেই। ভূমিকম্প থেমে গেছে। আসলে তারা কাঁদছিল নিজেদের ক্ষুদ্রতা বুঝে। বুঝে যে তারা কত অসহায়। বুঝে যে এই বিশাল পৃথিবীতে তারা কত ছোট। একটা মাত্র ঝাঁকুনি – আর সব শেষ হয়ে যেতে পারে।
রাস্তায় হাজার মানুষ। কিন্তু প্রত্যেকে একা। ভূমিকম্পের সময় সবাই একসাথে দৌড়েছে। কিন্তু প্রত্যেকে দৌড়েছে নিজের জীবন বাঁচাতে। কেউ অন্যের জন্য দাঁড়ায়নি। দাঁড়াতে পারেনি। কারণ বিপদ যখন সামনে, তখন মানুষ একা। একজন মা তার বাচ্চাকে নিয়ে দৌড়াচ্ছে। একজন বৃদ্ধ একা একা সিঁড়ি দিয়ে নামছে। একজন যুবক হাঁফাচ্ছে। প্রত্যেকে নিজের জগতে। প্রত্যেকের নিজস্ব ভয়। নিজস্ব মৃত্যু।
ফরাসি দার্শনিক কেউ একজন বলেছিলেন – আমরা একা জন্ম নিই, একা মরি। এর মাঝে যতই মানুষের সাথে থাকি না কেন, সেই একাকীত্ব কখনও যায় না। ভূমিকম্প সেই একাকীত্ব মনে করিয়ে দেয়। হাজার মানুষের ভিড়েও আমি একা। আমার ভয় শুধু আমার। আমার মৃত্যু শুধু আমার।
ছাব্বিশ সেকেন্ড। কতটা সময়? সাধারণত ছাব্বিশ সেকেন্ড কিছুই না। ফোন স্ক্রল করতে করতে কেটে যায়। একটা গান শুনতে শুনতে কেটে যায়। কিন্তু ভূমিকম্পের সময় ছাব্বিশ সেকেন্ড মনে হয়েছিল ছাব্বিশ ঘণ্টা। প্রতিটা সেকেন্ড আলাদা। প্রতিটা সেকেন্ডে হাজারটা চিন্তা। “মরে যাব নাকি?” “বাবা-মা কোথায়?” “এটাই কি শেষ?”
সময় থেমে গিয়েছিল। নাকি সময় এত দ্রুত যাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল থেমে আছে? বিজ্ঞান বলে, সময় একটা ধ্রুবক। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, সময় আপেক্ষিক। খুশির সময় দ্রুত যায়। দুঃখের সময় ধীর। ভয়ের সময় থেমে যায়। ভূমিকম্পের পর মনে হলো – আমরা হয়তো সময়ে বাঁচি না। বাঁচি মুহূর্তে। এবং কিছু মুহূর্ত এত তীব্র যে সেগুলো সময়কে থামিয়ে দেয়।
আমরা সারাজীবন নিরাপত্তা খুঁজি। ভালো চাকরি করি যাতে আর্থিক নিরাপত্তা থাকে। বাড়ি বানাই যাতে থাকার নিরাপত্তা থাকে। সম্পর্ক তৈরি করি যাতে মানসিক নিরাপত্তা থাকে। কিন্তু ভূমিকম্প বলে – নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। যে বাড়িতে আমরা নিরাপদ মনে করি, সেটাই ভেঙে পড়তে পারে। যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি, সেটাই কাঁপতে পারে। যে জীবনটা আমরা তৈরি করেছি, সেটা মুহূর্তে শেষ হয়ে যেতে পারে।
তাহলে আমরা কী করব? ভয়ে জীবন থামিয়ে দেব? না। এখানেই মজা। আমরা জানি সবকিছু অনিশ্চিত। তবুও আমরা বাঁচি। স্বপ্ন দেখি। ভালোবাসি। কাজ করি। এটাই হলো মানুষের অসাধারণত্ব। আমরা জানি শেষ আছে, তবুও শুরু করি। জানি মাটি কাঁপবে, তবুও দাঁড়িয়ে থাকি।
ভূমিকম্পের পর একটা ছেলে বলেছিল, “এত পড়াশোনা করে কী হবে? সব তো মুহূর্তে শেষ হয়ে যেতে পারে।” কথাটা ঠিক। সব শেষ হয়ে যেতে পারে। তাহলে জীবনের অর্থ কী? এই প্রশ্নটা মানুষ হাজার বছর ধরে করছে। দার্শনিকরা উত্তর খুঁজেছে। কেউ বলেছে ধর্মে অর্থ আছে। কেউ বলেছে কাজে। কেউ বলেছে প্রেমে। কিন্তু ভূমিকম্প যখন আসে, এসব উত্তর ফিকে হয়ে যায়।
তাহলে অর্থ কোথায়? হয়তো অর্থ খোঁজার মধ্যেই। হয়তো এই যে আমরা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠি, জেনেও যে একদিন শেষ হবে – এটাই অর্থ। ভূমিকম্পের পরও মানুষ বাড়ি বানাচ্ছে। জানে আবার ভূমিকম্প আসবে। তবুও বানাচ্ছে। এটাই তো জীবন। অর্থহীনতার মুখে দাঁড়িয়ে অর্থ তৈরি করা।
লক্ষ লক্ষ মানুষ একসাথে ভূমিকম্প অনুভব করল। কিন্তু প্রত্যেকের অনুভূতি আলাদা। কেউ ভয় পেয়েছে। কেউ রোমাঞ্চ পেয়েছে। কেউ কিছু বুঝেনি। কেউ ভেবেছে শেষ দিন এসে গেছে। আমরা একসাথে থাকি, কিন্তু একা। আমরা একই ঘটনা দেখি, কিন্তু ভিন্ন ভিন্নভাবে।
একজন লোক ফেসবুকে লিখল – “আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন।” আরেকজন লিখল – “আমার ভাগ্য ভালো।” আরেকজন লিখল – “বিজ্ঞান বলছে আরও বড় ভূমিকম্প আসবে।” একই ঘটনা, তিনটা ভিন্ন বোঝাপড়া। আমরা কি আসলে একসাথে আছি? নাকি শুধু একই জায়গায় আছি?
পরের দিন আবার ছোট একটা ঝাঁকুনি এলো। মাত্র ৩.৩ মাত্রা। কিন্তু এবার মানুষের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। কেউ কেউ দৌড়ালো। কেউ বসে রইল। কেউ হাসল। একদিনেই মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেল। প্রথম ভূমিকম্পে যে আতঙ্ক ছিল, দ্বিতীয়বারে তা নেই। এটা কি ভালো? নাকি খারাপ? ভালো এজন্য যে আতঙ্ক কমেছে। খারাপ এজন্য যে সতর্কতাও কমেছে।
মানুষ যেকোনো কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এমনকি বিপদেও। এটাই আমাদের বেঁচে থাকার কৌশল। কিন্তু এটাই আমাদের দুর্বলতাও। আমরা ভুলে যাই। আমরা অবহেলা করি। আমরা ভাবি – “আর তো কিছু হবে না।” কিন্তু মাটি তো জানে না আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মাটি আবার কাঁপবে। হয়তো আরও জোরে।
ভূমিকম্প কি শেষের সংকেত? নাকি শুরুর? কেউ কেউ বলছে – এটা আল্লাহর সতর্কবাণী। কেউ বলছে – এটা প্রকৃতির প্রতিশোধ। কেউ বলছে – এটা শুধু ভূতাত্ত্বিক ঘটনা। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো – আমরা এখন কী করব? কিছু মানুষ বদলে গেছে। তারা এখন সতর্ক। তারা বুঝেছে জীবন ভঙ্গুর। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে – প্রতিটা দিন গুরুত্বপূর্ণ। কিছু মানুষ বদলায়নি। তারা আবার ব্যস্ত হয়ে গেছে। ভূমিকম্প ভুলে গেছে।
আমরা মাটির সাথে কথা বলি না। মাটি শুধু মাটি। আমরা তার উপর হাঁটি। বাড়ি বানাই। চাষ করি। কিন্তু ভূমিকম্প মনে করিয়ে দেয় – মাটি জীবন্ত। মাটির নিজের ভাষা আছে। মাটি কথা বলে। শুধু আমরা শুনি না। আদিবাসীরা মাটিকে মা বলে। তারা জানে – মাটি দেয়, মাটি নেয়। মাটি রাগ করে, মাটি ক্ষমা করে। আমরা ভুলে গেছি। আমরা মনে করি মাটি আমাদের। কিন্তু আসলে আমরা মাটির।
ভূমিকম্পের পর একটা শিশু জিজ্ঞেস করেছিল, “মা, মাটি কি আমাদের উপর রাগ?” মা হেসে বলেছিল, “না বাবা, মাটি রাগ করে না।” কিন্তু আমি ভাবলাম – হয়তো করে।
ভূমিকম্পের পর আমি রাস্তায় হাঁটছিলাম। হঠাৎ মনে হলো পা-র নিচে মাটি নরম। দাঁড়িয়ে পড়লাম। মাটি ছুঁয়ে দেখলাম। শক্ত। কিন্তু তবুও মনে হচ্ছিল নরম। বুঝলাম – আসলে আমার বিশ্বাসটা নরম হয়ে গেছে। আগে যেটাকে পাথরের মতো শক্ত ভাবতাম, এখন জানি সেটা কাঁপতে পারে।
এটা কি খারাপ? না। হয়তো এটাই সত্য। মাটি কখনও শক্ত ছিল না। আমরা ভেবেছিলাম শক্ত। এখন জানি – কিছুই স্থায়ী না। এবং এই জানাটাই আসল শক্তি। যে জানে সব কিছু ভেঙে যেতে পারে, সে বেশি সাবধান। বেশি কৃতজ্ঞ। বেশি জীবন্ত।
আমরা যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা হয়তো কাঁপছে। হয়তো সবসময়ই কাঁপছিল। শুধু আমরা টের পাইনি। এখন টের পাচ্ছি।

একটু ভাবনা রেখে যান