
ঈদ আসে।
প্রতি বছর আসে। প্রতি বছর একই কথা বলে — এবার আনন্দ করো, এবার একসাথে হও, এবার সব ভুলে যাও।
মধ্যবিত্তের ঈদ মানে এই ভুলে যাওয়ার একটা অদ্ভুত চাপ। ভুলতে হবে। কিন্তু পকেট ভোলে না।
কিন্তু ৫০০ টাকার পকেট ৩,৫০০ টাকার হিসাব ভোলে না।
মানুষ বলে ঈদ সমতার উৎসব।
মিথ্যা।
ঈদ হলো আয়না। যে আয়নায় দেখা যায় তুমি কোথায় আছো। কতটুকু পেরেছো। কতটুকু পারোনি।
নতুন কাপড় কিনতে পারলে তুমি আছো।
না পারলে তুমি নেই।
এটাই সত্য। বাকি সব গল্প।
দোকানে যাও।
ঈদের কেনাকাটা মানে শুধু কাপড় কেনা না। মানে নিজেকে প্রমাণ করা।
দোকানদার দাম বলে। তুমি হিসাব করো। হিসাব মেলে না।
বেরিয়ে আসো।
“দেখছি” বলে বেরিয়ে আসো।
এই “দেখছি” — এই দুটো শব্দে একটা মানুষের পুরো সংকট লুকিয়ে আছে। কিন্তু কেউ দেখে না। দোকানদার পরের খদ্দেরের দিকে তাকায়।
গরিব মানুষ মিথ্যা বলতে শেখে।
শুধু বেঁচে থাকার জন্য না। সম্মান বাঁচানোর জন্য।
“এইটাই আমার পছন্দের।”
এই মিথ্যে আভিজাত্য — এই ভান যে আমার অভাব নেই, আমি চাই না বলে নিচ্ছি না — এটা একটা মানুষকে ভেতর থেকে খায়।
পছন্দ না। সামর্থ্য নেই। কিন্তু “সামর্থ্য নেই” বলা যায় না। কারণ সমাজ সামর্থ্যহীনতাকে ক্ষমা করে না।
তাই মিথ্যা।
তাই হাসি।
তাই “দেখছি।”
ধর্ম বলে, সিজদায় সবাই সমান।
ঠিকই বলে।
মাটিতে কপাল রাখলে পার্থক্য থাকে না।
কিন্তু উঠে দাঁড়ালেই পার্থক্য ফিরে আসে।
এই সামাজিক বৈষম্য নতুন না। কিন্তু ঈদের দিন এটা সবচেয়ে বেশি গায়ে লাগে।
একজনের গায়ে নতুন পাঞ্জাবি। একজনের গায়ে পুরনো শার্ট। দুজনেই একই দোয়া পড়েছে। কিন্তু মসজিদ থেকে বেরিয়ে দুজন দুই পৃথিবীতে ঢুকে যায়।
সিজদার সমতা দুই মিনিট স্থায়ী হয়।
উৎসব কী?
সবাই বলে, উৎসব হলো একসাথে হওয়া।
কিন্তু কিছু মানুষ উৎসবের দিনেই সবচেয়ে একা হয়।
ভিড়ের মধ্যে। হাসির মধ্যে। কোলাকুলির মধ্যে।
যখন সবাই একসাথে হয়, তখন যে আলাদা তার আলাদা থাকাটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
লজ্জা কী?
লজ্জা হলো অন্যের চোখে নিজেকে দেখা।
যে লোকটা পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, “নতুন পোশাক নাই নাকি?” — সে হয়তো খারাপ মানুষ না। সে হয়তো শুধু কথা বলতে চেয়েছিল।
কিন্তু সেই প্রশ্নটা একটা ক্ষত তৈরি করে।
কারণ প্রশ্নটার উত্তর জানা আছে। এবং সেই উত্তর বলা যাবে না।
“এইটাই পছন্দের।”
এই মিথ্যাটা শুধু লোকটাকে না, নিজেকেও বলতে হয়।
সবচেয়ে কঠিন মিথ্যা কোনটা?
অন্যকে বলা মিথ্যা না।
নিজেকে বলা মিথ্যা।
“ঠিক আছে।”
“সমস্যা নেই।”
“আগামী বছর হবে।”
এই মানসিক চাপ কেউ দেখে না। বুকের ভেতরে চাপা পড়ে থাকে, বছরের পর বছর।
এই কথাগুলো বলতে বলতে একটা মানুষ তার নিজের ক্ষুধাকে অস্বীকার করতে শেখে। তার নিজের চাওয়াকে ছোট করতে শেখে।
এটাকে পরিপক্কতা বলে না।
এটাকে বলে পরাজয়।
পরিবারের জন্য বাছো।
নিজে বাছো না।
অভাবের সংসারে এটাই নিয়ম। লেখা নেই কোথাও। কিন্তু সবাই জানে।
এটাকে ভালোবাসা বলে। এটাকে ত্যাগ বলে।
কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে না, যে মানুষটা নিজেকে বাদ দিতে দিতে এতদূর এসেছে — তার ভেতরে কতটুকু বাকি আছে?
ত্যাগ সুন্দর।
কিন্তু ত্যাগ যদি বাধ্যবাধকতা হয়, তাহলে সে আর ত্যাগ না।
সে দারিদ্র্য।
টাকা কী?
কবিরা বলেন টাকা সব না।
ঠিকই বলেন।
কিন্তু কবিরা কেউ ঈদের সকালে আলমারি খুলে পুরনো শার্টটা হাতে নিয়ে দাঁড়াননি। অন্তত সেই মুহূর্তে না।
এই কঠিন বাস্তবতা কবিতায় ধরা পড়ে না। পড়ার কথাও না।
টাকা সব না।
কিন্তু টাকা না থাকলে যা হয় — সেটাও সব।
মসজিদের পথে যেতে যেতে একটা মানুষ দেখে, পাশের বাড়ির লোকটা ছেলেকে নিয়ে হাঁটছে। দুজনেই নতুন কাপড়।
সে মানুষটা কী অনুভব করে?
হিংসা? না।
শুধু একটা ফাঁকা জায়গা।
কোথাও একটা জায়গা যেখানে কিছু থাকার কথা ছিল। নেই।
ফাঁকা জায়গাটা ব্যথা করে না। শুধু টানে।
সমাজ একটা কথা বলে না।
সমাজ কখনো বলে না যে গরিব হওয়া লজ্জার।
কিন্তু সমাজের প্রতিটা সংকেত সেটাই বলে।
নতুন কাপড় না থাকলে তুমি “সফল” না।
ঈদে বন্ধুদের বাড়িতে যেতে না পারলে তুমি “ভালো” না।
সন্তানকে ঈদের আনন্দ দিতে না পারলে তুমি “যোগ্য” না।
এগুলো কেউ মুখে বলে না।
কিন্তু সবাই বোঝে।
সবচেয়ে নিষ্ঠুর কথা হলো এই —
উৎসব মানুষকে একত্রিত করার জন্য তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু উৎসব হয়ে গেছে পরিমাপের যন্ত্র।
এই মানবিক অবক্ষয় ধীরে ধীরে হয়। কেউ টের পায় না।
তুমি কতটুকু কিনলে, কতটুকু খাওয়ালে, কোথায় গেলে, কী পরলে — এই সব মিলিয়ে ঠিক হয় তুমি এই উৎসবে কতটুকু ছিলে।
যে পরিমাপে পাস করতে পারে না, সে হাসে।
হাসে এবং বলে, “ঈদ মোবারক।”
বিকেলে শহর একটু শান্ত হয়।
পটকার শব্দ কমে। বাচ্চারা ঘরে ঢোকে। মায়েরা রান্নাঘরে যায়।
একটা মানুষ ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে।
নিচে শহরের আলো। দূরে মসজিদের মিনার। কাছে কোথাও পুরনো গান।
এটা একাকিত্বের গল্প না। একাকিত্ব মানে কেউ নেই। এখানে সবাই আছে। তবু কোথাও একটা ফাঁক।
এই ফাঁকটাই ঈদে মধ্যবিত্তের না বলা কথা।
এই মুহূর্তে উৎসব কোথায়?
শার্টে? খাবারে? কোলাকুলিতে?
নাকি ছাদে একা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার ভেতরেও?
রাত নামে।
আলমারিতে সেই শার্ট। ভাঁজ করা। পরিষ্কার।
আগামী বছরও এই শার্ট থাকবে।
হয়তো।
অথবা আগামী বছর অন্য কোনো হিসাব। অন্য কোনো “দেখছি।” অন্য কোনো মিথ্যা।
উৎসব আসবে।
প্রতি বছর আসবে।
জীবনের মানে কী — এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ওই আলমারিতে আছে। ভাঁজ করা শার্টে।
এবং প্রতি বছর এই পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ থাকবে, যারা উৎসবের দিনে আলমারি খুলে পুরনো কাপড়টা হাতে নেয়। ঈদে মধ্যবিত্তের না বলা কথা এখানেই থাকে — এই হাতে নেওয়ার মুহূর্তে।
ভাঁজ করা। পরিষ্কার।
পরে নেয়।
বের হয়।
হাসে।
এবং বলে — “ঈদ মোবারক।”

একটু ভাবনা রেখে যান