জীবন

নীরবতা

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া
শেয়ার
একা থাকা শেখায় নিজেকে চেনা, নীরব পরিবেশে খালি চেয়ার এবং বৃষ্টির শব্দ
একা থাকার সময় হয়ে উঠি নিজের অস্তিত্ব।

হ্যাপি আর আরাশ গ্রামে গেছে। তিন দিন থাকবে। আমি একা।

প্রথম রাতে ঘুম হলো না। কেন জানি না। শুয়ে রইলাম। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। সিলিং ফ্যানের শব্দ শুনলাম। এতদিন এই শব্দ কখনো শুনিনি।

সকালে উঠে চা বানাতে গেলাম। চুলা জ্বালালাম। পানি গরম হতে লাগলো। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। শুধু দাঁড়িয়ে। অন্য কোনো কাজ করলাম না।

পানিতে বুদবুদ উঠছে। ছোট ছোট। তারপর বড়। তারপর ফুটতে শুরু করলো।

আমি এতদিন এসব দেখিনি কখনো।

চা বানালাম। এক কাপ। শুধু আমার জন্য। দুধ ঢাললাম। লাল চা সাদা হয়ে গেল। চিনি দিলাম। নাড়লাম। চামচের শব্দ হলো। টুং টুং।

বসে চা খেলাম। জানালার পাশে। বাইরে রোদ উঠছে। গাছের পাতায় পড়ছে। পাতাগুলো যেন জ্বলছে।

চা শেষ হলো। কাপটা রেখে দিলাম। ধুলাম না। পরে ধুবো। তাড়া নেই।

আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। মুখ দেখলাম। চোখের নিচে কালি। কবে থেকে আছে জানি না। দাড়ি বেড়েছে। কামাইনি গতকাল থেকে।

এই মুখটা কার?

ফোন বাজলো। হ্যাপি।

“কেমন আছো?”

“ভালো।”

“খেয়েছো?”

“হ্যাঁ।”

“কী রান্না করেছো?”

“ডিম। রুটি।”

“শুধু এটুকু?”

“হ্যাঁ।”

কথা শেষ হলো। ফোন রাখলাম। ঘরটা আবার নীরব।

দুপুরে বারান্দায় বসলাম। একটা চেয়ার টেনে নিলাম। বসে রইলাম। কিছু করলাম না। শুধু বসে।

প্রতিবেশীর বাসা থেকে রান্নার গন্ধ আসছে। মাছ ভাজছে কেউ। গন্ধটা ভালো লাগছে। আমি ক্ষুধার্ত না। তবু গন্ধটা ভালো লাগছে।

একটা কাক এসে বসলো রেলিংয়ে। আমার দিকে তাকালো। আমি তার দিকে তাকালাম। কিছুক্ষণ এভাবে রইলাম। তারপর কাক উড়ে গেল।

বিকেলে সাইফুল ফোন করলো।

“কী করছো?”

“কিছু না।”

“বাসায়?”

“হ্যাঁ।”

“একা?”

“হ্যাঁ।”

“চা খাবে? আসি?”

“না। আজ না।”

“ঠিক আছে।”

ফোন রাখলাম। সাইফুল মনে হয় অবাক হয়েছে। আমি কখনো না বলি না তাকে। আজ বললাম।

সন্ধ্যায় বৃষ্টি শুরু হলো। জানালা খুললাম। বৃষ্টির শব্দ শুনলাম। টিনের চালে পড়ছে। ট্যাং ট্যাং ট্যাং।

বৃষ্টির গন্ধ এলো। মাটির গন্ধ। ভেজা ইটের গন্ধ।

দাঁড়িয়ে রইলাম জানালার কাছে। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম জানি না। হাত ভিজে গেল। মুখ ভিজে গেল।

বৃষ্টি থামলো। আমি তখনো দাঁড়িয়ে।

রাতে খাবার বানালাম। ভাত। ডাল। আলু ভাজি। নিজের জন্য রান্না করতে করতে মনে হলো, আমি এভাবে কখনো রান্না করিনি। সবসময় কারো জন্য করেছি। হ্যাপির জন্য। আরাশের জন্য। আজ শুধু আমার জন্য।

খেতে বসলাম। টিভি চালু করলাম। তারপর বন্ধ করলাম। শব্দটা যেন বাড়তি লাগছে।

নীরবে খেলাম। চিবোনোর শব্দ শুনলাম। গিলে ফেলার শব্দ শুনলাম। এসব শব্দ আমার।

খাওয়া শেষ করে প্লেট রাখলাম সিঙ্কে। ধুবো কাল সকালে।

বিছানায় শুয়ে মনে পড়লো আরাশের কথা। সে সবসময় ঘুমানোর আগে জিজ্ঞেস করে, “বাবা, তুমি কি স্বপ্ন দেখো?”

আমি বলি, “হ্যাঁ।”

“কী দেখো?”

“নানা কিছু।”

“আমি তোমার স্বপ্নে আসি?”

“হ্যাঁ। তুমি আসো।”

“আর মা?”

“মা-ও আসে।”

“আর তুমি?”

“আমি মানে?”

“তুমি কি তোমার স্বপ্নে তুমি আছো?”

আমি থেমে যাই। কী বলবো জানি না।

আরাশ বলে, “আমি আমার স্বপ্নে নেই। সবাই আছে। শুধু আমি নেই।”

আজ আরাশ নেই। আমি একা শুয়ে আছি। চোখ বন্ধ করলাম। ভাবলাম, আমি কি আমার স্বপ্নে আছি?

দ্বিতীয় দিন সকালে ঘুম ভাঙলো। কটা বাজে দেখলাম না। উঠলাম। চা বানালাম। আবার সেই বুদবুদ দেখলাম। আবার সেই শব্দ শুনলাম।

চা খেতে খেতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। রাস্তায় একজন মানুষ হাঁটছে। ধীরে ধীরে। কোথায় যাচ্ছে জানি না। তার হাঁটার গতি দেখলাম। একটা পা তুললো। রাখলো। আরেকটা পা তুললো। রাখলো।

আমি কখনো এভাবে কাউকে হাঁটতে দেখিনি।

দুপুরে ছাদে গেলাম। একটা চেয়ার নিয়ে গেলাম। বসলাম। আকাশের দিকে তাকালাম। মেঘ নেই। শুধু নীল।

কতক্ষণ তাকিয়ে রইলাম জানি না। চোখ জ্বালা করতে লাগলো। তবু তাকিয়ে রইলাম।

একটা মনে হলো। আকাশ কি আমাকে দেখছে? আমি যেমন তাকে দেখছি?

হাসি পেল। পাগলের মতো চিন্তা। তবু মনে হলো।

ফোন বাজলো। হ্যাপি আবার।

“কী করছো?”

“ছাদে বসে আছি।”

“কেন?”

“এমনি।”

“অসুস্থ?”

“না।”

“তাহলে?”

“শুধু বসে আছি।”

নীরবতা। তারপর হ্যাপি বললো, “ঠিক আছে। আরাশ কথা বলবে?”

“হ্যাঁ।”

আরাশের গলা শুনলাম। “বাবা, তুমি একা?”

“হ্যাঁ।”

“একা ভালো লাগে?”

ভাবলাম। কী বলবো। তারপর বললাম, “জানি না।”

“তুমি জানো না?”

“না।”

“ঠিক আছে। আমরা কাল আসছি।”

“ঠিক আছে।”

ফোন রাখলাম। আরাশের প্রশ্নটা মনে রইলো। একা ভালো লাগে?

জানি না।

বিকেলে বই পড়লাম। একই পৃষ্ঠা তিনবার পড়লাম। কিছু মনে রইলো না। আবার পড়লাম। আবার ভুলে গেলাম।

বই বন্ধ করে রাখলাম। জানালার বাইরে তাকালাম। সন্ধ্যা নামছে। আলো কমে আসছে। ধীরে ধীরে।

আমি বসে দেখলাম। আলো কমছে। অন্ধকার বাড়ছে। এই দুইয়ের মাঝে একটা সময় আছে। না আলো, না অন্ধকার।

আমি সেই সময়ে আছি।

রাতে আবার রান্না করলাম। আজ খিচুড়ি। সহজ। একসাথে সব দিয়ে দিলাম। বসে রইলাম। ফুটতে লাগলো।

গন্ধ এলো। ভালো গন্ধ। আমার রান্নার গন্ধ।

খেলাম। আবার নীরবে। আমার চিবোনো, গেলা, শ্বাস নেওয়া — সব শুনলাম।

ঘুমানোর আগে আয়নায় তাকালাম। মুখটা কেমন যেন লাগছে। অন্যরকম। ঠিক কী অন্যরকম বলতে পারবো না।

শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করলাম। ঘুম আসছে না। চোখ খুললাম। সিলিংয়ের দিকে তাকালাম। ফ্যান ঘুরছে। ঘুরছে। ঘুরছে।

আমি দেখছি।

তৃতীয় দিন সকালে মা-র কথা মনে পড়লো। মা মারা গেছেন অনেক আগে। তবু মনে পড়লো। মা কী বলতেন? কিছু মনে করতে পারলাম না। শুধু মনে পড়লো মা-র হাত। রান্নার সময় হাত নাড়তেন। ডান হাত। একটা আংটি ছিল। সোনার।

আর কিছু মনে নেই। শুধু হাত। নড়ছে।

চা বানালাম। আজ আর বুদবুদ দেখলাম না। শুধু বানালাম। দ্রুত।

বারান্দায় বসে চা খেলাম। প্রতিবেশীর ছেলে স্কুলে যাচ্ছে। ব্যাগ পিঠে। মা হাঁটছে সাথে। ছেলে কিছু বলছে। মা হাসছে।

আমি দেখছি। চুপচাপ।

দুপুরে ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্ন দেখলাম। কী স্বপ্ন মনে নেই। শুধু মনে আছে, স্বপ্নে আমি ছিলাম। আমি নিজে। অন্য কেউ না।

উঠে আবার আয়নায় তাকালাম। মুখ ধুলাম। মুখ মুছলাম। আবার তাকালাম।

কে এই লোক?

এই লোক আমি।

বিকেলে হ্যাপি ফোন করলো। “আমরা আসছি। রাতে পৌঁছাবো।”

“ঠিক আছে।”

“কিছু কিনতে হবে?”

“না।”

“নিশ্চিত?”

“হ্যাঁ।”

ফোন রাখলাম। তাকালাম ঘরের দিকে। এলোমেলো। বিছানা গোছানো না। বইগুলো ছড়ানো। কাপ-প্লেট সিঙ্কে।

গোছালাম। ধীরে ধীরে। প্রতিটা জিনিস তুললাম। রাখলাম। আবার তুললাম। আবার রাখলাম।

ঘর পরিষ্কার হয়ে গেল। দেখলাম। এই ঘর আমার। কিন্তু এখন আর আগের মতো না।

রাতে বসে রইলাম। অপেক্ষা করছি। কিসের অপেক্ষা করছি জানি। হ্যাপি আর আরাশ আসবে। তবু মনে হচ্ছে, অন্য কিছুর অপেক্ষা করছি।

কীসের?

জানি না।

সাড়ে দশটার দিকে দরজায় নক হলো। খুললাম। আরাশ ঢুকলো দৌড়ে। “বাবা!” হ্যাপি এলো পেছনে। ব্যাগ হাতে।

আরাশ আমাকে জড়িয়ে ধরলো। বললো, “আমরা এসে গেছি!”

আমি বললাম, “হ্যাঁ। তোমরা এসে গেছো।”

হ্যাপি বললো, “ঘর কত সুন্দর গোছানো!”

আমি কিছু বললাম না।

আরাশ বললো, “বাবা, তুমি কী করেছিলে তিন দিন?”

ভাবলাম। কী বলবো। তারপর বললাম, “কিছু না।”

“কিছুই না?”

“হ্যাঁ। কিছুই না।”

আরাশ হাসলো। “তুমি পাগল!”

হ্যাপি গেল রান্নাঘরে। আরাশ গেল তার ঘরে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। মাঝখানে। একা।

না। এখন আর একা না।

তবু মনে হলো, তিন দিন যা ছিলাম, সেই আমি কোথায় গেল?

রাতে শুয়ে আছি। হ্যাপি পাশে ঘুমিয়ে। আরাশ তার ঘরে। ফ্যান ঘুরছে। একই শব্দ। কিন্তু আজ আলাদা শোনাচ্ছে।

কারণ আজ আমি একা শুনছি না। তবু একা।

চোখ বন্ধ করলাম। ভাবলাম, আমি কি আমার স্বপ্নে থাকবো?

জানি না।

হয়তো থাকবো। হয়তো থাকবো না।

হয়তো তিন দিন যা শিখেছি, তা হলো — একা থাকা আর একা হওয়া আলাদা।

অথবা, কিছুই শিখিনি।

শুধু তিন দিন ছিলাম। আর কিছু না।

অস্তিত্ব একাকিত্ব নস্টালজিয়া নীরবতা

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

পাপড়ি

অক্টোবর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া

জীবন

এখানে

অক্টোবর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *