ব্লগ

একা থাকা সবার মাঝে

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আমরা তিনজন একসাথে বসে টিভি দেখছি। হ্যাপি, আরাশ, আমি। একটা সুখী পরিবারের ছবি।

কিন্তু আমি অনুভব করছি এক গভীর একাকীত্ব। চারপাশে মানুষ থাকলেও আমি একা।


এই একাকীত্ব কোনো শারীরিক বিচ্ছিন্নতা নয়। এটা মানসিক বিচ্ছিন্নতা।

আমি আমার পরিবারের সাথে আছি। কিন্তু আমার চিন্তা, আমার স্বপ্ন, আমার ভয়—এসব আমি কারো সাথে ভাগ করতে পারি না।

হ্যাপি আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। কিন্তু আমার কিছু চিন্তা আছে যা আমি তাকেও বলতে পারি না।

আমার যে স্বপ্নগুলো পূরণ হয়নি, সেগুলোর কথা আমি কাউকে বলি না। কারণ সেগুলো শুনে মনে হবে আমি অসন্তুষ্ট।

আমার যে ভয়গুলো আছে, সেগুলোর কথাও বলি না। কারণ একজন বাবার ভয় পাওয়া উচিত নয়।

আমার যে দুর্বলতা আছে, সেগুলো লুকিয়ে রাখি। কারণ পরিবারের প্রয়োজন একজন শক্তিশালী মানুষ।

এভাবে আমি নিজেকে একটা খোলসে বন্দী করে রেখেছি। সেই খোলসের বাইরে আমি দেখাই যা দেখানো উচিত। ভিতরে লুকিয়ে রাখি যা আমি আসলে।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমার আসল পরিচয় কী? আমি কি সেই মানুষ যাকে পরিবার দেখে? নাকি আমি সেই মানুষ যাকে আমি নিজে জানি?

আমি যখন একা থাকি, তখন আমি ভিন্ন মানুষ। তখন আমি আমার দুর্বলতা স্বীকার করি। আমার ভয় মেনে নিই। আমার অসম্পূর্ণতা অনুভব করি।

কিন্তু পরিবারের সাথে থাকার সময় আমি অভিনয় করি। অভিনয় করি যে আমি সব পারি। সব জানি। সব সামলাতে পারি।

এই অভিনয় আমাকে ক্লান্ত করে তোলে।

আমি চাই কারো কাছে মন খুলে বলতে যে আমি ভয় পাই। আমি জানি না আগামীকাল কী হবে। আমি চিন্তিত আরাশের ভবিষ্যতের জন্য।

কিন্তু এসব কথা কাউকে বলতে পারি না।

আমার বন্ধুরা আছে। কিন্তু তাদের সাথেও আমি সব কথা বলি না। তাদের কাছেও আমি একটা ইমেজ বজায় রাখি।

আমি লেখালেখি করি। সেই লেখায় কিছুটা মন খুলি। কিন্তু সেখানেও সব সত্য বলি না।

আমি যেন একটা দ্বীপ। চারপাশে মানুষের সমুদ্র। কিন্তু আমি একা।

আমি বুঝি, এই একাকীত্ব আমার নিজের তৈরি। আমিই নিজেকে একটা খোলসে বন্দী করে রেখেছি।

কিন্তু এই খোলস ভাঙতে ভয় পাই। কারণ খোলস ভাঙলে হয়তো পরিবার আমাকে দুর্বল মনে করবে।

আমি চাই না আরাশ জানুক যে তার বাবার ভয় আছে। আমি চাই না হ্যাপি জানুক যে আমি কত অনিশ্চিত।

তাই আমি লুকিয়ে রাখি আমার আসল মনের কথা।

কিন্তু এই লুকানো আমাকে একাকী করে তোলে। এমনকি পরিবারের মাঝেও।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, অন্য পুরুষরাও কি এমনি একাকীত্ব অনুভব করে? তারাও কি তাদের আসল মনের কথা কারো সাথে ভাগ করতে পারে না?

আমি মনে করি, আমাদের সমাজ পুরুষদের শেখায় শক্তিশালী হতে। কিন্তু শেখায় না কীভাবে মানবিক হতে হয়।

আমরা শিখি কীভাবে দায়িত্ব নিতে হয়। কিন্তু শিখি না কীভাবে নিজের মনের কথা বলতে হয়।

আমরা শিখি কীভাবে সমস্যার সমাধান করতে হয়। কিন্তু শিখি না কীভাবে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করতে হয়।

এই শিক্ষা আমাদের একাকী করে তোলে।

আমি চাই আমার এই একাকীত্ব কমুক। কিন্তু কীভাবে?

আমি চাই আমার পরিবারের কাছে আমার আসল মনের কথা বলতে। কিন্তু সাহস পাই না।

আমি চাই আমার বন্ধুদের কাছে আমার দুর্বলতা স্বীকার করতে। কিন্তু লজ্জা লাগে।

আমি চাি আমার লেখায় আমার সব সত্য বলতে। কিন্তু ভয় পাই।

তাই আমি রয়ে যাই একাকী। এই সুখী পরিবারের মাঝেও।

আমি জানি, এই একাকীত্ব আমার নিজের পছন্দ। কিন্তু এটা আমার বেছে নেওয়া পছন্দ নয়। এটা আমাদের সমাজের চাপিয়ে দেওয়া পছন্দ।

আমি আশা করি, একদিন আমি এই খোলস ভেঙে বের হতে পারব। আমার আসল মনের কথা বলতে পারব।

সেদিন হয়তো আমার একাকীত্ব কমবে। এবং আমি সত্যিকারের মানুষ হতে পারব।

কিন্তু সেদিন কবে আসবে, জানি না।

ততদিন আমি থেকে যাব। একা। এই সুখী পরিবারের মাঝেও।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *